মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে একের পর এক দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করায় আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। বিশেষ করে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন এক অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শতাধিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় হাজারো যাত্রী হঠাৎ করেই বিপাকে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি কেবল একটি পরিবহন সংকট নয়, বরং মানবিক দায়িত্ব ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির একটি বড় পরীক্ষাও বটে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত মোট ১০২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমজীবী মানুষ, প্রবাসী কর্মী, চিকিৎসা বা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণরত নাগরিক। অনেকেই দীর্ঘ প্রস্তুতি ও আর্থিক চাপ সামলে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বাতিলের কারণে তারা এখন অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এই অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যাত্রীদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
প্রথমত, বিমানবন্দর এলাকায় আটকেপড়া যাত্রীদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অনেক যাত্রী দূর-দূরান্ত থেকে এসে রাত কাটানোর জায়গা পাচ্ছেন না। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর যৌথ উদ্যোগে ন্যূনতম মানসম্মত থাকার ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ খাবার ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, যাত্রীদের তথ্যসংকট দূর করা জরুরি। ফ্লাইট বাতিল বা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে অস্পষ্টতা মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। নিয়মিত আপডেট, হেল্পডেস্ক বৃদ্ধি এবং স্পষ্ট ঘোষণা যাত্রীদের মানসিক চাপ অনেকটাই কমাতে পারে। আধুনিক বিমানবন্দরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সংকট মুহূর্তে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা এখন আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, যাত্রীদের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পুনঃনির্ধারিত টিকিট, অতিরিক্ত চার্জ মওকুফ, প্রয়োজন হলে আংশিক ক্ষতিপূরণ এবং বিনা জরিমানায় রিফান্ডের সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত। আন্তর্জাতিক সংকটের দায় যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়।
এ কথা সত্য যে, যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি এবং মানবিক সংবেদনশীলতাই একটি দেশের সক্ষমতার পরিচয় দেয়। এ মুহূর্তে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং যাত্রীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে, কিন্তু দায়িত্ববোধ বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। যাত্রীদের নিরাপত্তা, সম্মান এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এ সংকটই প্রমাণ করবে, দুর্যোগের সময়ে আমরা কতটা সংগঠিত এবং কতটা মানবিক। বর্তমান সরকার মাত্রই দায়িত্ব নেয়ার কারণে তাদের জন্য এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং তো বটেই। কিন্তু জনগণের একটি প্রত্যাশা এই সরকারের কাছে আছে এবং সরকারের দায়িত্ব হলো প্রত্যাশার আলোকে জনগণের অধিকার ও স্বার্থ নিশ্চিত করা। বিশ্বের অনেক দেশেই মধ্যপ্রাচ্যগামী অসংখ্য নাগরিক আঁটকা পড়েছেন। তাদের সাথে পরামর্শ করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করা উচিত। যুদ্ধাবস্থা যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলেও সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে বাংলাদেশের প্রশাসনের প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।