গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রশাসনিক কাঠামো। নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন সেবাÑনগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক সুবিধাÑএসবের কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ওপর। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই জনমনে গভীর গুরুত্ব বহন করে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জয় পাওয়ার পর সম্প্রতি কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক হিসেবে দলীয় পরিচয়সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগের সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির আলোকে এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি এবং জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও উত্থাপন করে। কারণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মূল দর্শনই হলোÑজনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালিত হওয়া।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন ও সংস্কার প্রক্রিয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী ধাপ হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনমুখী একটি পরিবেশ তৈরি হবেÑ এমন ধারণাও জনপরিসরে শক্তিশালী হচ্ছিল। কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে দলীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশাসনিক দায়িত্বে বসানো সে প্রত্যাশার সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
নৈতিকতার প্রশ্ন এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের আমানত; তাই প্রশাসনিক পদগুলোকে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বণ্টন করা হলে তা নিরপেক্ষতার ধারণাকে দুর্বল করে। এতে প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে কি নাÑ এই সন্দেহ জন্ম নেয়। আরও বড় কথা, জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ বিলম্বিত হলে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনমনে আরেকটি উদ্বেগও তৈরি করেÑস্থানীয় সরকার নির্বাচন কি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে? যদি এমন ধারণা শক্তিশালী হয়, তবে তা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। গণতন্ত্রের শক্তি নির্বাচনেই; আর স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। ফলে নির্বাচনকে পাশ কাটিয়ে প্রশাসনিক নিয়োগের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাষ্ট্রের জন্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তবতার প্রয়োজন থাকতে পারে, অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণেরও যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু সে ব্যবস্থাও হতে হবে স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ। অন্যথায় তা জনগণের কাছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো আস্থা পুনর্গঠন। সরকার যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারে বিশ্বাসী হয়, তবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। একটি সুস্পষ্ট নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা এবং প্রশাসনিক পদগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখাÑএ দুটিই হতে পারে জনআস্থা পুনরুদ্ধারের কার্যকর পথ। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা রাজনৈতিক আচরণ, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকারকে দলীয়করণের পথ থেকে দূরে রাখা তাই শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়Ñএটি গণতন্ত্র রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। অন্তত বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় এটি নিশ্চিত হওয়া খুবই জরুরি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঠুনকো সব অজুহাতে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের যে ফর্মুলা ফ্যাসিবাদী সরকার চালু করেছিল; তা থেকে আমরা কবে পুরোপুরি বের হতে পারবো- তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেল।