চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করা হয়েছিলো। কারণ, যুদ্ধের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্যে অনেক প্রবাসীর কর্মচ্যুতি, কর্মঘন্টা হ্রাস প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ভাটির টানের আশঙ্কা করা হয়েছিলো। কিন্তু সার্বিক দিক বিবেচনায় আমাদের প্রবাসী আয় এখনো ইতিবাচক বৃত্তেই রয়ে গেছে। মূলত, আমাদের প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম অস্থিরতা চলছে। এতে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মধ্যে নানা ধরনের উদ্বেগ-উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে।
তবে চলমান এ পরিস্থিতেও বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ে এখনো বড় ধনের ছন্দপতন ঘটেনি বরং এখন আগের চেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে ডলারের দামও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রভাব না পড়লেও মধ্যপ্রাচ্য সংকটে প্রবাসী আয় নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্থিরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাসরত বাংলাদেশীরা আতঙ্কে রয়েছেন। তারপরও ঈদ সামনে রেখে তাঁরা দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। অনেকে যাকাতের জন্যও অর্থ পাঠাচ্ছেন। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও প্রবাসী আয় বাড়ছে। যা স্বস্তিদায়ক বলেই মনে হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১১ দিনে দেশে ১৯২ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে। এরমধ্যে ১১ মার্চ এক দিনেই দেশে এসেছে ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে দেশে এসেছিল ১৩৩ কোটি ডলার। ফলে গত বছরের মার্চের প্রথম ১১ দিনের তুলনায় চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশের বেশি। এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছিল ১ হাজার ৯৮২ কোটি ডলার। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
প্রবাসী আয়ের এমন উত্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। ১১ মার্চ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২৯ কোটি ডলার বা ৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী, এ রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫৬ কোটি বা ২৯ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্য সংকটে প্রবাসী আয় কেনায় ডলারের দাম বেড়ে গেছে। গত ১৩ মার্চ ব্যাংকগুলো ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা দরে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনেছে। এর আগে ১২২ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত দামে প্রবাসী আয় কিনেছিল ব্যাংকগুলো। বেশি দামে প্রবাসী আয় কেনার কারণে আমদানিতেও ডলারের দাম বেড়ে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা ছাড়িয়ে গেছে। এক সপ্তাহ আগেও আমদানির জন্য ব্যাংকগুলো ডলার বিক্রি করেছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত। ডলার কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্রমতে, যুদ্ধের কারণে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বিদেশী রেমিট্যান্স হাউসগুলো ডলারের বেশি দাম প্রস্তাব করছে। আগে ১২২ টাকা দরে প্রবাসী আয়ের ডলার কেনা যেত। সেটি বেড়ে এখন ১২৩ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এতে আমদানিতে ডলারের দাম বেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ‘মধ্যপ্রাচ্য আমাদের প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস। তাই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থানকারী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে সরকারকে। সেখানে তাদের কোনো সহায়তা প্রয়োজন হলে দিতে হবে। এতে তারা স্বস্তি বোধ করবে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই যুদ্ধ শেষ হলেই দেশগুলো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে। তখন বাড়তি শ্রমিক প্রয়োজন হবে। আমরা সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারি।’ এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত মুদ্রার হার-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানেও ডলারের দাম বেড়ে গেছে। ৩ মার্চ ডলারের গড় দাম ছিল ১২২ টাকা ৩৩ পয়সা, মঙ্গলবার তা বেড়ে হয় ১২২ টাকা ৫৮ পয়সা। আর সর্বশেষ ১২ মার্চ তা আরও বেড়ে হয় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের দাম ১২৩ টাকার বেশি বাড়বে না এমন বার্তা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমদানি দায় মেটানোর চাপ ও সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়বেই। তখন রিজার্ভ থেকেও ডলার-সহায়তা দিতে হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে অর্থনীতির আসন্ন ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলেছেন, সংকট কতটা হবে, তা এখনো পরিষ্কার না। বৈশ্বিক সংকট হলে রিজার্ভ ও ডলারের ওপর চাপ আসবে। তাই রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। এ ছাড়া সুদহার কমাতে এখনই নীতি সুদহারে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। আসন্ন চাপ কেটে গেলে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক সভায় অর্থনীতিবিদেরা এসব পরামর্শ দেন। তাঁরা মনে করেন, জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও এখনই তা গ্রাহক পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।
তবে প্রবাসী আয়ের এমন ইতিবাচক প্রবাহে একেবারে পুলকিত হওয়ার কিছু নেই বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত এ ধারা অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব হবে না। তাই জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে হলে আমাদেরকে এখন থেকেই বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান করতে। একই সাথে জা¦লানীর জন্যও নতুন চিন্তা মাথায় রাখা দরকার। যেকোন দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিতে হবে আগাম প্রস্তুতি। অন্যথায় উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।