মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, মানুষ কেন রাজনীতি করে? রাজনীতির যে অঙ্গন, তা তেমন মনোহর নয়। আছে চ্যালেঞ্জ, বিপদ, জেল-জুলুম, মৃত্যুর ঝুঁকিও। তবে রাজনীতির ভিন্ন চিত্রও আছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে আছে পাওয়ার নেশা। নীতি-নৈতিকতা সেখানে কর্পুরের মত উড়ে যায়, পড়ে থাকে শুধু বয়ান। ফ্যাসিস্ট আমলে আমরা বয়ানের রাজনীতি দেখেছি। ক্ষমতার লোভে বিদেশী মন্ত্রণায় জাতিকে বিভক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্ক উসকে দিয়ে যার যা নেওয়ার তা নিয়েছে, আর যার যা দেওয়ার তা দিতে পেরেছে সহজেই। ’৭১ কার্ডে আসলে দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধের ঝান্ডা ও সগৌরবে উড্ডীন হতে পারেনি। ন্যায়, সাম্য, মানবিক মর্যাদার পায়রা ডানা মেলতে পারেনি। বরং দিনের পর দিন পালক খসে পড়েছে। পায়রা দুর্বল হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের গল্পকে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতার স্বার্থে, ইসলাম ধর্মকেও ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতার স্বার্থেÑ এমন প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে।
রাজনীতির কথা বলতে গেলে সময়ের কথা বলতে হয়। বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গে চব্বিশের জুলাই বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে উঠেছে। কারণ এ সময় দেশে সংঘটিত হয়েছে বহুল আকাক্সিক্ষত এক গণঅভ্যুত্থান। এ সময়ে আধিপত্যবাদের দোসর ফ্যাসিস্ট সরকারের শুধু পতন হয়নি, পালাতে বাধ্য হয়েছে ভারতে। সেই দিনগুলোর কথা এখন আমাদের কতটা মনে পড়ছে? দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যাংক, বীমা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, পুলিশ-প্রশাসন সব তছনছ হয়ে গিয়েছিল। সাহসী তরুণদের নেতৃত্বে গোটা জাতি দেশবিরোধী ওই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। রক্তের দামে জীবনের দামে সংঘটিত হয়েছিল সেই অভ্যুত্থান। আহত ও পঙ্গু ছাত্র-জনতা এখনো কাতরাচ্ছে হাসপাতালের বেডে। এরপর আমরা দেখলাম নির্বাচনের রাজনীতি। কত বয়ান, কত কৌশল। ভোটের মাঠে নামলে কি নীতি-নৈতিকতায় টান পড়ে?
ফ্যাসিস্টরাও তখন আপন হয়ে ওঠে! নির্বাচনের সময় বিশাল কর্মযজ্ঞে জাড়িয়ে পড়ে নির্বাচন কমিশন। বড় চ্যালেঞ্জই বটে। অবশ্য সব নির্বাচন কশিনের চেহারা এক রকম হয় না, কাজের চেহরাও ভিন্ন ভিন্ন। কেউ দিনের ভোট রাতে করেন। এবার অবশ্য ভোট শান্তিপূর্ণ ও সুশৃংখল ছিল। তবে এটাই দৃশ্যকাব্যের সবকিছু নয়। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর গণমাধ্যমে এমন কিছু চিত্র উঠে এসেছে, যা কাম্য ছিল না। বিশেষ করে ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব, ভোট গননা সিটে ঘষামাজা, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনাবলী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, সরকারও গঠিত হয়েছে। এখন ইশতেহার তথা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা। এ যেন এক অসম্ভব কাজ, কঠিন তো বটেই। সরকারের মধুচন্দ্রিমার দিন খুবই স্বল্প। জনগণতো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চাইবে। সরকার পরিচালনার কাজটা আসলেই কঠিন। তবুও কেন যে মানুষ সরকার গঠন করতে যায়। অবশ্য দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের কথা আলাদা। যাদের মহত্বর আদর্শ থাকবে, স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার ভয় থাকবে- তারা তো চ্যালেঞ্জ নিয়েই রাজনীতির অভিযাত্রায় যুক্ত হন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আদর্শবাদের এই রজনীতি এখন কতটা সক্রিয় আছে? আসলে প্রিয় স্বদেশে আমরা ক্ষমতালোভী রাজনীতির প্রাবল্যই লক্ষ্য করেছি। যার চূড়ান্ত রূপ জাতি প্রত্যক্ষ করেছে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট আমলে।
পরিবর্তনের আকাক্সক্ষায়, নতুন বাংলাদেশের আকক্সক্ষায় দেশের মানুষ এবার ভোট দিয়েছে। বিএনপি দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছে, দায়িত্ব তারা পেয়েছেও। এবার দায়িত্ব পালনের পরীক্ষা। আমরা চাই নতুন সরকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোক, কারণ, সরকার তো শুধু বিএনপির নয়, গোটা দেশবাসীর। প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীমন্ডলী যখন জলদগম্ভীর কন্ঠে শপথ বাক্য পাঠ করেন, তখন বিষয়টটা উপলব্ধি করা যায়।
শপথের আলোকে মানুষ এখন কাজ দেখতে চায়। তবে সরকারের রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দ্রুত পরিবর্তনের কাজটা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন, আদালত, শিক্ষা, প্রায় সবক্ষেত্রেই একের পর এক রদবদল চলছে। সরকার দেশ চালাবেন, তাই সবকিছু মনমতো সাজিয়ে নিতে চাইছেন তারা। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন একটাইÑ এতসব রদবদল কি দেশের স্বার্থে, নাকি প্রাধান্য পেয়েছে দলীয় স্বার্থ? আগামীতে এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে সরকারকে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার ইতিহাস তেমন সুখকর নয়। এই রদবদল ঝটিকায় আসলে প্রাধান্য পায় পরবর্তী নির্বাচনেও ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা। বিষয়টি কেমন বোকা বোকা মনে হয় না? এবারের ইশতেহার বাস্তবায়নে সফল হলে তো আগামীর প্রশ্ন আসে। কথা ও কাজে নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্ব না পাওয়ায় আমাদের বহু নেতা ভিন্নভাবে রাজনীতির ঘুঁটি সাজান। তবে জুলাই অভ্যুত্থনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। পুরনো ধারার রাজনীতি ক্রমেই অচল হয়ে পড়ছে। মানুষ এখন রাজনীতির কূটচাল, ভূরাজনীতি এবং আধিপত্যবাদের বয়ান বুঝতে পারে। তাই মানুষের প্রশ্ন এখন সুনির্দিষ্ট ও তীক্ষè। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তার কিছুটা প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ইতিহাসে এত ভালো ফল তো এর আগে জামায়াতে ইসলামী কোনোদিন করেনি। নতুন দল এনসিপিও ভালো ফল পেয়েছে। দীর্ঘদিন ভুল রাজনীতির অস্তাচলগমনে কিছুটা সময় তো লাগবেই। এই সময়টায় বিরোধীদল কোন পথে এগোয়, কেমন কর্মকৌশল গ্রহণ করেÑ সেটাও দেখার মতো একটা বিষয় হবে। কারণ রাজনীতিটা দেশের জন্য হলেও, দেশের রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছে ‘ভূরাজনীতি’। আগামী পাঁচ বছরের পরীক্ষাটা শুধু সরকারের জন্য নয়, গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বিরোধী দলের জন্যও বটে। তবে চাপটা সরকারের ওপরই বেশি।
সরকার তো সবেযাত্রা শুরু করলো। সামনে সময় আছে। তবে সরকারের যাত্রাটা আরো ভালো হতে পারতো। বিএনপির এমপিরা শুধু এমপি শপথ নিলেন, দ্বিতীয় শপথটি নিলেন না। শুরুতেই ছন্দভঙ্গ। বিরোধী জোটও গেলেন না, মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে। ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। মন্ত্রিপরিষদের অনেকের বক্তব্যেই দায়িত্বশীলতার ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সড়কে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে কেউ বলছেন, ওটা আসলে চাঁদাবাজি নয় এক ধরনের সমঝোতা। কোনো মন্ত্রী কি এমন ভাষায় কথা বলতে পারেন? কোনো মন্ত্রী আবার বলছেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দ এ দেশে চলবে না। আরবী-ফারসি ভাষার প্রতি তিনি এত বিরাগ কেন? তিনি আসলে কোন সংস্কৃতির মানুষ? তিনি কি বাংলাদেশের মানুষের বোধ-বিশ্বাস ও আশা-আকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান করতে চান? এদিকে সরকার আবার দেশের সিটি করপোরেশনগুলোয় রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এতে স্থানীয় সরকারের নির্দলীয় চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অল্প ক’দিনের এ ঘটনাগুলোর লক্ষ্য কিন্তু ভালো নয়।
নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করাই কিন্তু সব কিছু নয়। যে সব অপকর্মের জন্য ফ্যাসিস্ট সরকারকে জনগণ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, সেসব থেকে দূরে থাকতে হবে শাসক দলকে। অথচ প্রতিপক্ষকে হুমকি-ধমকি ও আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। চাঁদাবাজি ও টর্চার সেলের সন্ত্রাসী আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে। টর্চার সেলে নির্যাতনের অপরাধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের দলীয় নেতাকে বহিষ্কারে বাধ্য হয়েছেন বিএনপির নিপুণ রায় চৌধুরীরা। আর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় চাঁদা না দেওয়ায় কারখানা ভাঙচুর ও পণ্য লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটলো। ২৫ ফেব্রুয়ারির একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় দুই কলামে মুদ্রিত হয়েছে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চিত্র। এখন বিবেচ্য বিষয় হলো, কোন পথে চলবে বিএনপি সরকার। এক পথ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পুরনো পথ, অপরটি জুলাইয়ের অঙ্গীকার পূরণের নতুন পথ।