সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ এর ৩৬ জুলাইয়ের গণভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে ৬ কোটিরও বেশি নাগরিক নিজেদের ভোট প্রদানের মাধ্যমে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সিট জিতলেও জামায়াত ও তার জোট উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন লাভ করেছে। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী এই প্রথম কোন নির্বাচনী ফলাফলে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাদেশ তার ইতিহাসের যুগান্তকারী এক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে যার প্রমাণ নির্বাচনের এই ফলাফল। এই ফল কেবল নতুন এক সরকার গঠনের পরিক্রমাই নয় বরং তা একই সাথে দেশটির নিজস্ব পরিচয়, সার্বভৌমত্ব এবং তার আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকেও ইঙ্গিত করে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে বিএনপিকে জনগণ একদিকে যখন সরকার গঠনের দায়িত্ব হস্তান্তর করেছে, ঠিক একই সাথে জামায়াতে ইসলামী ও তার জোটকে ৪০ শতাংশের বেশি ভোট প্রদান করে দেশটির বিরোধীদলের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে ক্ষমতাসীনদের জবাদিহিতা নিশ্চিত করা ও জনগণের যৌক্তিক চাহিদা সংসদে তুলে ধরার জন্য, যা তাদেরকে একটি নীতি-নির্ধারক এক শক্তিতে পরিণত করেছে।

এই ফলাফলকে কেবল সাধারণ একটি নির্বাচনের ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ তার অস্তিত্বের সংকট, সামরিক হস্তক্ষেপ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বামপন্থী ও ইসলামপন্থীদের দ্বন্দ্ব এবং বহির্শক্তির হস্তক্ষেপ সহ নানা ঘটনার পরিক্রমায় আজকের এই পর্যায়ে এসেছে। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোর সাথে সাধারণ জনতার মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধকে প্রাধান্য দানকারী অংশের সর্বদা একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। আর জামায়াতে ইসলামী হলো সেই ভাবধারার অন্যতম একটি রাজনৈতিক শক্তি।

জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস কেবলমাত্র একটি দলের ইতিহাস নয়। এর শেকড় উপমহাদেশের ইসলামী ভাবধারার পুনর্জাগরণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশে দীর্ঘ রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক প্রহসণের বিচারে ফাসি প্রদান, কর্মীদের উপর রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং জুলুমের স্ট্রিমরোলার চলা সত্ত্বেও সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে দলটি নিজেদের অস্তিত্বকে সর্বদা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এ দৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের পরিচয়, অস্তিত্ব, ইসলামী মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের এক অসামান্য প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একারণে জামায়াত জোটের ৪০% ভোট অর্জন শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী সাফল্যই নয় বরং তা অবদমিত মূল্যবোধের এক পুনর্জাগরণ হিসেবেই মূল্যায়নযোগ্য।

অপরদিকে ক্ষমতায় আসা বিএনপির জন্যও রয়েছে আকাশচুম্বী চ্যালেঞ্জ। বিদ্যমান কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ভঙ্গুর রাজনৈতিক প্রতিহিংসাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, বৈদেশিক চাপের মতো কঠিন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী নতুন এই সরকার। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, পোশাক-রপ্তানী নির্ভর ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং তরুণদের প্রত্যাশাগুলোর সমাধান খুবই শীঘ্রই বের করতে হবে এই সরকারকে। এতদসত্ত্বেও সামগ্রিক বিষয়টি কেবল দেশের অর্থনৈতিক সমাধান বের করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং বাংলাদেশের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন হচ্ছে, ন্যায়বিচার ও আদালতের মূল্যবোধের পুনরায় প্রতিষ্ঠা এবং সরকার ও জনগণের মধ্যকার একটি আস্থার সম্পর্ক গরে তোলা। এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর প্রধান বিরোধীদল হিসেবে ভারসাম্যপূর্ণ, নীতিবাচক-ইতিবাচক এবং জনমুখী একটি রাজনৈতিক ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে সর্বদা জবাবদিহীতার আওতায় আনা এবং একইসাথে দেশের স্থীতিশীলতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ও গঠনমূলক একটি রাজনৈতিক ধারা গঠন করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সুসংহত একটি করবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের পুনর্বিবেচনা অনিবার্য। বঙ্গোপসাগর হয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় প্রতিযোগী ভারত ও চীনের মধ্যকার দোদুল্যমান এই দেশকে ভূরাজনীতিতে তার নিষ্ক্রিয় ভূমিকাকে খুব শীঘ্রই সক্রিয় একটি নিয়ামক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা আবশ্য কর্তব্য। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে D-8 সংস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান এক গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহণ করে। D-8 হচ্ছে পশ্চিমা সুদ ও পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপরীতে উন্নয়নশীল ৮টি দেশের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি। তুরস্ক, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইরান, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও মিশর এবং সর্বশেষ যুক্ত আজারবাইজানকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যার বহুবিধ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কৌশলগত সুযোগ ব্যবহার করে বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে নির্দিষ্ট একটি দেশের হাত থেকে সুরক্ষিত করতে পারবে।

শক্তিশালী একটি বাংলাদেশের প্রভাব কেবল অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মায়ানমারের আরকানের মুসলিমরা আজও একটি প্রশাসনিক নীপিড়নের পিষ্ট হচ্ছে, গ্রামগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অসংখ্য নারী ও শিশু সীমান্তে কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ আজও লাখ লাখ আরাকানী ভাই-বোনদেরকে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তের অপরপ্রান্তে ভারত, নাগরিকত্ব আইন এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী নীতির প্রয়োগের মাধ্যমে সেখানকার মুসলিমদের উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে যার কারণে আজ সেখানকার মুসলিমদের উপর মনস্তাত্ত্বিক এক নীপিড়ন অব্যাহতভাবে চলছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী এক বাংলাদশের কন্ঠস্বর সাধারণ একটি কূটনৈতিক বিবৃতির চেয়েও অনেক বেশী অর্থবহ।

ঠিক এই প্রেক্ষিতে, জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী একটি বিরোধীদল হওয়া অনেক বেশি গুরুত্ব বহণ করে। নিজেদের আত্মপরিচয় সম্পর্কে সচেতন এবং উম্মাহর দৃষ্টিভঙ্গীকে ধারণকারী একটি রাজনৈতিক ধারার প্রধান বিরোধীদল হিসেবে সংসদে অবস্থান মায়ানমার, ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের জন্য সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক এক বিজয়ের প্রতীক। এটা অনস্বীকার্য যে কেবলমাত্র একটি দেশের পক্ষে পুরো দক্ষিণ এশিয়া মুসলিমদের উপর চলমান জুলুমকে রুখে দেয়া অসম্ভব। তবে শক্তিশালী এক বাংলাদেশ কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিকভাবে আইনী উদ্যোগ এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে অঞ্চলে বিদ্যমান জুলুমকে রুখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

এক্ষেত্রে তুরস্কের দায়িত্ব একেবারে দিনের আলোর মতো স্পস্ট। তুরস্ক হচ্ছে D-8 এর রূপকার এবং সংস্থাটির শীর্ষস্থানীয় শক্তিশালী একটি দেশ। বাংলাদেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আনকারার উচিত শিল্পায়ন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়া এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধিকে আরও জোরদার করা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশকে তার নিজের পরিচয়ে মাথা উঁচু করে বিশ্বমঞ্চে যে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে সেই দৃষ্টিভঙ্গীকে ধারণ করে ভ্রাতৃত্বসুলভ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া আনকারার কর্তব্য। কারণ নিজ পরিচয়ে আত্মবিশ্বাসী নয় এমন এক দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর এক অর্থনীতিতে পরিণত হতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না।

বাংলাদেশ আজ এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। হয় সে বিশ্ব মঞ্চে নিষ্ক্রিয় এক শক্তিতে পরিণত হবে নতুবা নিজের সভ্যতাকে আকড়ে ধরে ইসলামী সভ্যতাকে লালন করে দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্য রক্ষায় অন্যতম এক নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হবে। নির্বাচনের ফলাফলই তার প্রমাণ যেখানে দেশের সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার ও সুশাসন ছিল জোরালো দাবি। এরকম জনমত খুব সহসাই পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্মের এই দাবী ও চাওয়াকে ধারণ করে, সরকার এবং বিরোধীদল যদি তা নীতিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারে তবে তা কেবল ঢাকা নয়, দক্ষিণ এশিয়া নয় পুরো বিশ্বকে প্রভাবান্বিত করবে।

বাংলাদেশের এই পুনর্জাগরণ তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন অর্থনৈতিক সংস্কার সম্পন্ন হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দল-মত নির্বিশেষে সকলে নিজের আত্মপরিচয়কে দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ করতে পারবে। আবারও বলছি, শক্তিশালী এক বাংলাদেশ কেবল বাংলাদেশের জনগণের জন্যই নয় বরং আরাকান ক্যাম্পে অবস্থানরত মজলুম জনপদ, ভারতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় কাতরানো মুসলিম সম্প্রদায় এবং আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বসবাসের স্বপ্ন দেখা মুসলিম বিশ্বের লাখো জনপদের জন্য এক আশার কিরণ হতে পারে বাংলাদেশ। নতুন এক যুগে প্রবেশ করা বাংলাদেশকে শুধুমাত্র দর্শকের সারি থেকে না দেখে তুরস্কের উচিৎ বাংলাদেশের লড়াইয়ে কাধে কাধ মিলিয়ে ভ্রাতৃপ্রতিম একটি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।

লেখক : মোস্তফা কায়া

এমপি, তুরস্ক, ন্যাটো পার্লামেন্ট সদস্য, ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাদেত পার্টি, অনুবাদক: আবিদ ইহসান