আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি আজ নতুন করে সামনে এসেছেÑআন্তর্জাতিক আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি এটি কেবল দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রযোজ্য, আর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কার্যত এর ঊর্ধ্বে অবস্থান করে? জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই প্রশ্নটিকেই তীব্রভাবে উত্থাপন করেছে। বিবিসি রেডিও ৪-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তার উদ্বেগ কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়; বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন।
গুতেরেস সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র দায়িত্বহীনভাবে আচরণ করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। তার ভাষায়, বহুপাক্ষিক সমাধানকে যুক্তরাষ্ট্র এখন অপ্রাসঙ্গিক বলে বিবেচনা করছে। এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় পরিসরের সামরিক হামলা ও দেশটির প্রেসিডেন্টকে আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলোকে কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের গ্রিনল্যান্ড সংযুক্তির হুমকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সেই ‘শক্তির রাজনীতি’র কথাই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আইনের ভূমিকা ক্রমেই গৌণ হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক আইন মূলত কোনো নৈতিক উপদেশমাত্র নয়; এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর গড়ে ওঠা একটি কাঠামো, যার উদ্দেশ্য ছিল শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর একতরফা আগ্রাসন ঠেকানো এবং বিশ্বকে আবারও সর্বগ্রাসী যুদ্ধের পথে ফিরে যাওয়া থেকে রক্ষা করা। জাতিসংঘ সনদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছেÑকোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারবে না এবং বলপ্রয়োগ হবে শেষ বিকল্প, তাও সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বারবার এই নীতিকে পাশ কাটিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইরাক আক্রমণ ছিল এর সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ। ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’-এর ঠুনকো অজুহাতে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল, যার বৈধতা পরবর্তীতে নিজেরাই প্রমাণ করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তান যুদ্ধ, সিরিয়া ও লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ, ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে একতরফা সরে আসাÑসব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত উপেক্ষিত হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ধ্বংসই হয়নি; বরং গোটা অঞ্চলজুড়ে অস্থিতিশীলতা, শরণার্থী সংকট এবং সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এই প্রবণতা আরও প্রকাশ্য ও আক্রমণাত্মক রূপ নেয়। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির নামে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান ও চুক্তিগুলোকে দুর্বল করা হয়। জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর’ বলে আখ্যা দেওয়া হয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবর্তে একতরফা শক্তি প্রয়োগকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি যুক্তি বারবার তুলে ধরা হয়-জাতিসংঘ অকার্যকর, বড় সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ, আর ভেটো রাজনীতির কারণে অনেক সময় কেবল দর্শকের ভূমিকায় থাকে। এই সমালোচনায় সত্যের অংশ অবশ্যই আছে। কিন্তু জাতিসংঘের দুর্বলতা কি আন্তর্জাতিক আইন ভাঙার লাইসেন্স হতে পারে? কোনো রাষ্ট্র যদি নিজেই বিচারক, আইনপ্রণেতা ও কার্যকরকারী হয়ে ওঠে, তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অস্তিত্বই বা কী থাকে?
এখানেই জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগের গুরুত্ব। তার আশঙ্কা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে নয়; বরং এটি একটি নজির স্থাপনের ভয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেকে আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে, তবে অন্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও একই পথ অনুসরণ করবে। তখন আন্তর্জাতিক আইন আর আইনের শাসনের প্রতীক থাকবে না; বরং তা পরিণত হবে ক্ষমতার খেলার একটি আলংকারিক ভাষ্যে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুর্বল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো। তাদের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং টিকে থাকার লড়াই অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। আইন যদি শক্তির কাছে পরাজিত হয়, তবে বিশ্ব আবার সেই অরাজকতার দিকে ফিরে যাবে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল।
সুতরাং প্রশ্নটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র আইনের ঊর্ধ্বে কি নাÑএটি আসলে বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে সেই নেতৃত্ব হতে হবে আইনের মধ্যে থেকে, বহুপাক্ষিকতার ভিত্তিতে এবং দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক আইন ভেঙে পড়লে তার দায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই নয়; এর পরিণতি বহন করতে হবে গোটা বিশ্বকেই।