এক একটা সময়, এক একটা কাল, মানুষের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য তেমন একটা সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এখন এই অভ্যুত্থান নিয়ে যেমন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হচ্ছে, তেমনি হচ্ছে সাংস্কৃতিক আলাপও। অনেক বিদগ্ধের আলোচনা আমাদের মুগ্ধ করছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিবেচনাবোধ সৃষ্টি করছে নানা প্রশ্নও। প্রশ্ন বিষয়ক আলোচনাটা একটু পরে করাটাই বোধহয় সঙ্গত হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের সাফল্যের পেছনে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল, নাগরিকদের অবদান ছিল, ছিল সাংগঠনিক তৎপরতা এবং কলাকৌশলও। আর অবাক ব্যাপার ছিল স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসা ছাত্রদের সম্মিলিত মিছিল। ফ্যাসিস্ট শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেতনায় সবাই মিলিত হয়েছিল এক মোহনায়। মানুষ যখন সৎ ভাবনায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, তখন সে নিজেকে নতুন করে উপলব্ধি করে, খুঁজে পায় নিজেকে প্রকাশের নতুন ভাষাও। সব অচলায়তন ও সীমাবদ্ধতা তার সামনে তখন খান খান হয়ে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানে তা আমরা উপলব্ধি করেছি।

জুলাই আন্দোলনের ভাষায় ছিল নতুন উদ্দীপনা। পোশাকী ভাষার বদলে সংগ্রামীরা বেছে নিয়েছে প্রয়োজনের ভাষা, গতিময় ভাষা। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফারসির মিশেলে গড়ে উঠেছে আন্দোলনের এক নতুন ভাষা। আন্দোলনের ভাষায় যুক্ত হয়েছিল বৈষম্য, কোটা, ফ্যাসিস্ট, জালেম, ইনকিলাব, জিন্দাবাদ, আজাদি, ইনসাফ, শাটডাউন, মার্চ টু ঢাকা, বাংলা ব্লকেড ইত্যাদি শব্দ। স্লোগানের ভাষাও লক্ষ্য করার মতো। ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা’Ñ এইসব স্লোগানে মানুষের আকাক্সক্ষার কথা উচ্চারিত হয়েছে। ফলে সর্বস্তরের সব বয়সের মানুষ যুক্ত হয়েছে মিছিলে, সমাবেশে। জুলাই আন্দোলনের উচ্চারণে বার্তা ছিল, আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে।

এখন কেউ কেউ বলছেন, জুলাইয়ের চেতনা নানাভাবে কালিমালিপ্ত হচ্ছে। আগের সেই ঐক্যও এখন নেই। ঐক্যে ভাঙনের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। এর কারণও আছে। জুলাই আন্দোলনে দল-মত নির্বিশেষে সবার লক্ষ্য ছিল এক, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন। এই লক্ষ্য পূরণের পর রাজনৈতিক দলগুলো ফিরে গেছে আপন আপন লক্ষ্যে। তারা দলের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কর্মসূচি নিয়ে এখন ব্যস্ত। সামনে আবার জাতীয় নির্বাচন। তবে এসবের মধ্যেও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের স্বীয় অঙ্গীকার পালনে সৎ থাকতে হবে। বিচার, সংস্কার এবং স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো সঙ্গত ভূমিকা পালন না করলে তাদের নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আশা করি এ ব্যাপারে তারা সচেতন থাকবেন।

কেউ কেউ বলছেন, জুলাই আন্দোলনের বহুত্ববাদী রূপ এখন আর নেই। বরং একরৈখিক, সহিংস ও জোরাজুরির ভেতর টেনে আনা হচ্ছে এই আন্দোলনকে। একটি বিশেষ গোষ্ঠী জুলাই চেতনাকে কুক্ষিগত করতে চাইছে এবং তা মব ও সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে। প্রসঙ্গত তারা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা তুলে ধরছেন। এভাবে তারা জুলাই চেতনা কারিমালিপ্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন। না, জুলাইচেতনা কালিমালিপ্ত হচ্ছে না। কিছু কিছু ভুল কাজ হচ্ছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে অগ্নিসংযোগ একটি ভুল কাজ, এর অর্থ আবার এই নয় যেÑ এ কারণে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ভুল কাজগুলো শূদ্ধ হয়ে যাবে। দেশ ও জাতির প্রতি তাদের অনাকাক্সিক্ষত ভূমিকার একটা প্রতিক্রিয়া তো হবেই, তবে সেটা আরো অর্থপূর্ণ উপায়ে হতে পারতো। প্রসঙ্গত এখানে দৈনিক সংগ্রাম ও নয়াদিগন্ত পত্রিকায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বিশেষ ঘরানার পত্রিকা দুটি এবং তাদের সমর্থক সুশীলগোষ্ঠী তো তখন এই সন্ত্রাস ও মবের বিরুদ্ধে কিছুই বলেননি। দৈনিক সংগ্রামের প্রবীণ সম্পাদক জনাব আবুল আসাদের ওপর যেভাবে হামলা হলো, তাঁকে গ্রেফতার করা হলো, তার বিরুদ্ধে তো তাঁরা টুঁ শব্দটিও করেননি। সমবেদনা ও সৌজন্য প্রকাশের ভদ্রতাটুকুও তারা প্রদর্শন করতে পারেননি। তারা হয়তো ভেবেছিলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার আরো বহুকাল টিকে থাকবে। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকেও তারা কম অপমান করেননি। আর এখন তো পারলে কদমবুচি করে ফেলবেন। এই তো তাদের নৈতিক অবস্থা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে কিছু বয়ানের প্রচলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন ‘অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি’, উদার সংস্কৃতি’। আমরা জানি, যে কোনো রাজনীতি ও সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকে জীবনদর্শন। মার্কসবাদের আলোকে পরিচালিত রাজনীতি ও সংস্কৃতি যদি সাম্প্রদায়িক না হয়; তাহলে ইসলামী দর্শনের আলোকে পরিচালিত রাজনীতি ও সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক হতে যাবে কেন? কারো কর্মকাণ্ড সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট হলেই কেবল তাকে সাম্প্রদায়িক বলে অভিযুক্ত করা যায়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, শ্রেষ্ঠ নবী মোহাম্মদ (স:) তো ইসলামী জীবন দর্শনের আলোকেই সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তাকে কি কেউ সাম্প্রদায়িক কিংবা অনুদার বলেছেন? বরং পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাকে ‘রাহমাতুললিল আলামীন’ বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ শুধু মানব জাতির জন্য নয়, সমগ্র সৃষ্টি জগতের জন্যই নবী মোহাম্মদ (স:) হলেন রহমত স্বরূপ। ফলে বলা চলে, ইসলামের নবী যেমন সাম্প্রদায়িক নন, তেমনি তার অনুসারী মুসলিমও সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। তবে ব্যক্তি মানুষ হিসেবে কোনো মুসলিম যদি কোনো অন্যায় করে, অপরাধ করে, তবে অপরাধের শাস্তি তার প্রাপ্য।

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইসলামী রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের সমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতদিন যে সমর্থন ছিল না, তা কিন্তু নয়। ফ্যাসিবাদী শাসনের নির্মম নির্যাতনের ভয়ে সাধারণ মানুষ কিছুটা নীরব ছিল। এখন গণতান্ত্রিক পরিবেশে তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারছেন, সমর্থন ব্যক্ত করতে পারছেন। এমন বাতাবরনে ক্ষুদ্রমনা কিছু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বলছেন, জুলাই আন্দোলনের ‘বহুত্ববাদী রূপ’ এখন আর নেই। তারা আরো বলছেন-জুলাই হলো উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক চেতনার এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মোহনা। কথা তো ঠিকই আছে। তবে প্রশ্ন হলো, বহুত্ববাদী রূপের পরিচয় কী? এখানে কি ইসলামী ধর্ম-দর্শনে বিশ্বাসী লোকদের জায়গা নেই? আর অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে মোহনার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে সবার ঠাঁই হবে তো? দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশলের মাধ্যমে ইসলামী ঘরানার লোকদের মোহনায় মিলিত হতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে না তো? বাংলাদেশের ভূমিতে দাঁড়িয়ে আজ একটি কথা স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, খামার বাংলার জনতাকে আর শোষিত ও বঞ্চিত করা যাবে না। বৈষম্যের দিন শেষ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃস্টান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার যৌক্তিক অধিকার আজ নিশ্চিত করতে হবে। জাতিরাষ্ট্রের এটাই বৈশিষ্ট্য। এখানে সংখ্যা, পরিমাণ, পরিমিতির বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে। ১০ জনের যে পরিমাণ অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের প্রয়োজন হবে; ৯০ জনের প্রয়োজনটা তার চাইতে নিশ্চয়ই অনেক বেশি হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই হিসেবটা প্রযোজ্য হবে। এখানে যেন আবার হিংসা-বিদ্বেষ উঁকি না দেয়, বঞ্চনা ও বৈষম্যের ভিত্তিহীন প্রোপাগাণ্ডাও যেন প্রশ্রয় না পায়। জাতির ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করার মত দেশি-বিদেশী অপশক্তি সক্রিয় আছে।

বাংলাদেশে নাগরিকদের এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। এখানে প্রসঙ্গত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের একটি বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। তার সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি বলেছিলেন, ‘এখন জগৎ জুড়িয়া সমস্যা এই নহে যে, কি করিয়া ভেদ ঘুচাইয়া মিলন হইবে, কিন্তু কি করিয়া ভেদ রক্ষা করিয়া মিলন হইবে। সেইটাই আসল কথা। কারণ সেইখানে কোনো ফাঁকি চলে না, প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকের জায়গা ছাড়িয়া দিতে হয়।’ রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্যে অনেক কিছুরই সমাধান নিহিত রয়েছে। এখানে সংখ্যায় যারা কম, তাদের স্বার্থ যেমন রক্ষিত হয়েছে; তেমনি সংখ্যায় যারা বেশি, রক্ষিত হয়েছে তাদের স্বার্থও। আসলে এখানে রাষ্ট্রর প্রতিটি নাগরিকের স্বার্থ রক্ষার বার্তা পাওয়া যায়। জুলাইয়ের চেতনাও আমাদের একই কথা বলে যায়।