কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল এখন কারাগারে। যৌনকাজে শিশুদের পাচারের দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন তিনি। সমাজের সাধারণ মানুষ তো এমন জঘন্য কাজের কথা ভাবতেই পারেন না। অথচ বিলাসবহুল জীবনের অধিকারী গিলেন ম্যাক্সওয়েল শিশুদের শুধু যৌনকাজেই যুক্ত করেননি, ওদের পাচারের কাজেও লিপ্ত ছিলেন তিনি। এমন কুৎসিত রুচির মানুষদের মেলামেশা ছিল উচ্চমহলে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজাত শ্রেণীর মানুষরা ছিলেন এদের বন্ধু ও খদ্দের। এই অভিজাত শ্রেণীর মানুষরাই তো বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার নেতা এবং সভ্যতার শাসক। এপস্টিন ফাইল থেকে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে উপলব্ধি করা যায়-মানবজাতি বর্তমানে এক মেকি ও অমানবিক সভ্যতায় বসবাস করছে। এ সভ্যতা মানুষের বসবাসের যোগ্য নয়। বর্তমান সময়ে নারীবাদীদের বয়ানও লক্ষ্য করার মতো। আসলে ‘নারীবাদ’ বা ‘পুরুষতন্ত্র’ মানব সমাজের কল্যাণ করতে পারে না। গিলেন ম্যাক্সওয়েল তো একজন নারী, তারপরও তিনি কী করে কন্যা শিশুদের যৌনকাজে যুক্ত করলেন এবং লিপ্ত হলেন পাচার কাজে? আসলে কাক্সিক্ষত মানব সমাজের জন্য অবয়বের নারী বা পুরুষ নয়, আমাদের প্রয়োজন নৈতিক মানুষ। অথচ নীতি ও নৈতিকতার চর্চা তো বর্তমান সভ্যতায় তেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এখন ‘পারসূট অব ম্যাটেরিয়ালিজমের’ চর্চা হচ্ছে, মানুষ টাকার পেছনে পাগলের মতো ছুটছে, নীতিবোধ এখানে কাজ করছে না। মাদক ও বিকৃত যৌনাচার মানুষকে অসুস্থ করে তুলছে, তাদের ভোগবিলাসেরও কোনো সীমা নেই। সীমালংঘনে অভ্যস্ত দাম্ভিক নেতারা আগ্রাসনকে বেছে নিয়েছেন। ফলে পৃথিবীতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা। এমন সভ্যতায় নর কিংবা নারীর সম্মানজনক জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এপস্টিনের বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল এখন কারাগারে। কারাগারে তার দৈনন্দিন জীবন কেমন কাটছে, নতুন একটি ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে তা সামনে এসেছে। গিলেন তার সাবেক প্রেমিক এপস্টিনের সঙ্গে শিশু পাচারের অপরাধে ২০২১ সালে দোষী সাব্যস্ত হন। ভিডিওটি যখন ধারণ করা হয়, তখন তাকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের কুখ্যাত ‘মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে’ রাখা হয়েছিল। উপলব্ধি করা যায়, ডিটেনশন সেন্টারে গিলেন কোনে সম্মানজনক জীবন-যাপন করছেন না। প্রশ্ন জাগে তার আগের বিলাসবহুল ও আরামদায়ক জীবনটা কি সম্মানজনক ছিল? যে জীবনে তার কাজ ছিল শিশুদের পাচার ও যৌনকাজে যুক্ত করা। আসলে কারাগারের জীবনের চাইতে তার আগে জীবনটা ছিল আরো অসম্মানজনক ও ঘৃণ্য। শিশু নিপীড়নের কাজটা কখনোই, কোনো সভ্যতায়ই সম্মানজনক হতে পারে না। অথচ বর্তমান সভ্যতায় ক্ষমতাবান কিছু মানুষের সহযোগিতায় শিশু নিপীড়নের কাজটি চলতে পেরেছে।

বর্তমান সভ্যতায় ‘নিপীড়নের’ কাজটি শুধু শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সভ্যতার শাসকরা যখন নীতিহীন হয়ে পড়ে, যখন তাদের অস্তিত্বে ‘নৈতিক মেরুদণ্ড’ বলে কিছু থাকে না, তখন তার মন্দ প্রভাব লক্ষ্য করা যায় সর্বত্র। এখন আমাদের ভূরাজনীতিটা কেমন? বিশ্বের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শোবিজ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, খাদ্য ব্যবস্থা, জলবায়ু, বায়ু দূষণসহ কোনো কিছু কি কাংখিত অবস্থায়, তথা যথাস্থানে আছে? যথাস্থানে নেই, এর কারণ ‘নিপীড়নের মারণাস্ত্র’। নীতিবর্জিত পরাশক্তিবর্গ বিশ্বের মানুষকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সবক্ষেত্রে নিপীড়নের তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। সভ্যতার এমন শাসকদের আমলে মানুষের মুক্তি নেই। অপমানজনক এবং অমানবিক এমন সভ্যতায় মানুষকে তার কর্তব্য পালন করতে হবে। তবে এ ব্যাপারে সময়ের দাবি পূরণে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে পরমাণু শক্তিধর দেশের নাগরিকদের। কারণ তাদের নেতারাই বিশ্বে চালিয়ে যাচ্ছে নিপীড়নমূলক তাণ্ডব। জনতা তাৎপর্যপূর্ণভাবে জেগে উঠলে নীতিভ্রষ্ট শাসকরা ভীত হবেন, তখন তাদের নিপীড়নের হাত সংকুচিত হবে। তাই এখন গোটা বিশ্বে প্রয়োজন গণজাগৃতি, তবে শুরুটা যেন হয় পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোতে।