ইরানে মার্কিন-ইসরাইল যৌথ হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকরা বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকেই ইতোমধ্যেই কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। মূলত, ইরানের ওপর যৌথ হামলা এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের প্রতিশোধমূলক পাল্টা মিসাইল ও ড্রোন নিক্ষেপ শুরুর এক সপ্তাহ না যেতেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশীদের এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কুয়েতসহ সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো শ্রমবান্ধব দেশগুলোতে কিছু বাংলাদেশী কর্মী ইতোমধ্যে কাজ হারাতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। ফলে রেমিটেন্স প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশী শ্রমিকরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশীর জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে রেমিটেন্স প্রবাহের ওপরও। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্য করেই ইরান থেকে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে বলে তারা দাবি করছেন। সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছে, দিনের বেলায় পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই মিসাইল ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ।

প্রবাসীরা জানাচ্ছেন, মূলত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার গুঞ্জনের পর থেকেই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশই আমদানিনির্ভর হওয়ায় সরবরাহ সঙ্কটের প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। অন্যদিকে যারা বিদেশ থেকে দেশে ফিরতে আগ্রহী, তাদের জন্য দুবাই সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে বলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতির আহামরি কোনো উন্নতি হচ্ছে না।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে আাসলেও কুয়েতে পরিবেশ মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে মাঝে মধ্যে সাইরেনের শব্দে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। মিসাইলগুলো সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে না, আমেরিকান ঘাঁটিগুলোই লক্ষ্যবস্তু। তবুও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আশপাশে পড়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ভুক্তভোগীরা জানাচ্ছেন, অফিস-আদালতের কাজ চললেও নির্মাণখাতে দৈনিকভিত্তিক কর্মরত অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বিল্ডিং নির্মাণকাজ স্থগিত থাকায় অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন। একই চিত্র দুবাই, আবুধাবি, কাতার ও বাহরাইনেও দেখা যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাকরি ও বেতন অনিশ্চিত হলে রেমিটেন্স কমে যাবে, দ্রব্যমূল্য বাড়বে এবং অনেকে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের দ্রুত প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। অন্যথায় সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।

দুবাইয়ের বুর্জ আল খলিফা এলাকার প্রবাসী বাংলাদেশীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দিনের বেলায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও রাতে আতঙ্ক বিরাজ করে। তারা বলছেন, বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেল অফিসের দু’কিলোমিটার দূরে আমেরিকান দূতাবাসে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া যুদ্ধ শুরুর পর দুবাইয়ে চারজন বাংলাদেশীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানাচ্ছেন, ‘রাত নামলেই ঝলমলে দুবাই অন্ধকার নগরীতে পরিণত হয়। বড় বড় ভবনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা হচ্ছে।’ সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি বা তথ্য প্রকাশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বলে জানা গেছে। নির্দেশ অমান্য করলে এক লাখ দিরহাম জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। যা প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে ঢাকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিমান চলাচলেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী গন্তব্য নিজ দেশে যেতে পারছেন না, আবার অনেকে বিদেশে আটকা পড়েছেন। এমতাবস্থায় আটকে পড়া যাত্রীদের ফিরিয়ে আনতে ঢাকা-দুবাই-ঢাকা রুটে দু’টি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পেয়েছে বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। কিন্তু তবুও পরিস্থিতির আহামরি কোনো উন্নতি হয়নি। সংস্থাটির পক্ষে জানানো হয়েছে, মানবিক বিবেচনায় এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আবুধাবি এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ ইউএস-বাংলা, ইত্তিহাদসহ কয়েকটি এয়ারলাইন্সকে বিশেষ অনুমতি দিয়েছে বলে জানা গেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রবাসীরা বলছেন, যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ না হলে তাদের জীবন-জীবিকা ও দেশের অর্থনীতির ওপর এর গভীর প্রভাব পড়তে পারে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে ইরান-মার্কিন-ইসরাইল ত্রিমুখী সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকটা অনিশ্চয়তার মুখেই পড়েছে। যুদ্ধের শুরুতেই অনেকেই কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। আর যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতির আরো বড় ধরনের অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের রেমিটেন্স প্রবাহেও বড় ধরনের অবনতি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তাই সরকারকে এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। অন্যথায় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।