পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে আলোচনাও কম হয় না। তবে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার সুযোগ কম থাকে। বরং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচনার মাত্রাটাই বেশি। ‘দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি’, ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’-এমন অভিযোগ তো ব্যাপক। ১ নবেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে ‘টুয়ার্ডস আ কমপ্রিহেন্সিভ ফরেন পলিসি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইনস্টিটিউট ফর পলিসি, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামের একটি চিন্তন প্রতিষ্ঠান এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বিজ্ঞজনরা কথা বলেন। তাদের আলোচনায় পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে অনেক কথাই উঠে আসে। আলোচনা সভায় বেশ জোরালো ভাষায় বলা হয়, প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জুলাইয়ের চেতনায় স্বাধীন ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হবে। ভূরাজনীতিতে নিজেদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে কৌশলগত দূরদর্শিতাও দেখাতে হবে। স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে ভারতকে ছাড়াই দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট সার্ককে (SAARC) এগিয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এ মুহূর্তে বিজ্ঞজনরা কী ভাবছেন তা তাদের মুখে শুনলে উত্তম হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের একটা অবস্থান নেওয়ার সময় এসেছে। সার্ককে সক্রিয় করার ক্ষেত্রে ভারত যদি সঙ্গে থাকে তাহলে তা খুবই ইতিবাচক। আর যদি তারা গোঁ ধরে থাকে, তবুও এগিয়ে যেতে হবে। দুনিয়াতো কারও জন্য বসে থাকবে না।’ বাংলাদেশের আত্মপ্রত্যয়ী পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন মন্তব্য করে সাবেক এ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজনকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য আমি একজন ডিপ্লোম্যাটকে ছয় মাস রেখে বদলি করে দিলাম, এভাবে দক্ষ ডিপ্লোম্যাট তৈরি হয় না। ভারত দক্ষ ডিপ্লোম্যাট তৈরি করতে পেরেছে, পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পেরেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদদের নানা বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ থাকবে। তবে জাতীয় স্বার্থে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি, সে বার্তা দিতে হবে বাইরে। আপনি ভারতকে দেখেন; তাদের মধ্যে বিবাদ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে তারা ঐক্যবদ্ধ।’ ফাউন্ডেশন ফর সিকিউরিটি অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ফজলে এলাহী আকবর আলোচনায় বলেন, ‘কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুতা-এ পররাষ্ট্রনীতি একটা অবাস্তব ও কাব্যিক নীতি। বিগত আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে রূপান্তর করা হয়েছিল, যা ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য লজ্জা।’ আওয়ামী লীগের আমলে ১১টি প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্য দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এমন একটা সংসদ র্ছিল তখন, যেখানে একটি চুক্তিও কখনো প্রকাশ করা হয়নি, আলোচনা করা হয়নি। প্রতিরক্ষানীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে ভারসাম্য ও সমন্বয় করা ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
অতীতের পররাষ্ট্রনীতির একটা চিত্র আমরা পেলাম। এ চিত্র আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক ও লজ্জাকর। একটি স্বাধীন দেশের পররাষ্ট্রনীতি এমন হতে পারে না। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সার্বভৌমত্বের চেতনাকে শানিত করেছে। স্বাধীনতার সড়কেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ফ্যাসিবাদী আমলে আমরা নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দেখেছি। এমন নীতিকে বর্জন করে আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে, রাজনীতিকে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আলোকে মর্যাদাশীল করে তুলতে হবে। এমন ধারাবাহিকতায় দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে স্বাধীন ও মর্যাদাময় পররাষ্ট্রনীতির পতাকা উড্ডীন রাখতে আমরা সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। দুর্বল ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির জন্য তো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি।