বিশ্বব্যবস্থার সংকট বাড়ছে। এখানে তাত্ত্বিক আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই, ফিলিস্তিন এবং ইউক্রেনের উদাহরণই যথেষ্ট। এখন আবার যোগ হয়েছে ভেনেজুয়েলা কাণ্ড। এ নিয়ে কথা কম বলাই ভালো। সভ্যতার শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্টের আচরণ কী করে এমন হয়? যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তিনি কি পারেন একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে স্ত্রী-সমেত তুলে নিয়ে যেতে? এখন আবার তিনি বলছেন, আমি ভেনেজুয়েলার ‘ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট’। রোববার সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে ট্রাম্প লিখেন, ‘ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট’। ওই পোস্টে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ দায়িত্বে রয়েছেন বলে লিখেন ট্রাম্প। তিনি তো থেমে থাকার পাত্র নন। ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণা দিয়েছেন। হুমকি দিয়েছেন কলোম্বিয়া ও কিউবাকে। তিনি প্রকাশ্যেই বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনের কোনো প্রয়োজন নেই, আমার নীতিই যথেষ্ট। একজন প্রেসিডেন্ট এমন দুর্বিনীত হন কেমন করে? তিনি কি স্বাভাবিক আছেন, সুস্থ আছেন? বিভ্রান্ত কোনো ‘কাউবয়’ এমন প্রলাপ বকতে পারেন, কিন্তু একজন প্রেসিডেন্টের পক্ষে কি তা শোভা পায়?
ট্রাম্প কি কোনো পাগলা ঘোড়ায় সওয়ার হয়েছেন? এ ঘোড়া তো থামছে না। এখন আবার লড়াইয়ে নেমেছেন ইরানের সাথে। সবদেশেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থাকে। তেমন সংকট আছে ইরানেরও। কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ তো নিজেদের সংকট নিজেরাই সমাধানের চেষ্টা করবে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দেশের সংবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংবিধান ও আইন-আদালতকে মান্য করেই দেশের সংকটের সমাধান করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে জাতিসংঘ কথা বলতে পারে। কিন্তু জাতিসংঘ তো এখন একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর দায় বর্তায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিবর্গের ওপর। জাতিসংঘের কথা তো এখন কেউ শুনছে না। এর অর্থ আবার এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ বিশেষ কোনো দেশের ওপর হস্তক্ষেপ কিংবা আগ্রাসন চালাতে পারবে। সব দেশেরই অধিকার রয়েছে, সংকটের সমাধান নিজেরা করার।
ইরানে অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মত সমস্যা রয়েছে। এর প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের আহ্বানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হয় দেশটিতে। পরে তা সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালায়। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগে সোমবার পর্যন্ত অন্তত ৬৫০ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের হামলায় নিহত হন নিরাপত্তাবাহিনীর শতাধিক সদস্য। এদিকে বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সমর্থনই দিচ্ছে না, ইরানে হামলা চালানোরও হুমকি দিয়েছে। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরানও। এরমধ্যে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারের সমর্থনে রাস্তায় নেমে এসেছেন লাখ লাখ জনতা। সরকারী কর্মকর্তারা দেশব্যাপী জনতার এ সমর্থনকে শত্রুর ষড়যন্ত্রের মুখে ঐক্য ও সংহতির অকাট্য প্রমাণ বলে বর্ণনা করেছেন। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, দেশব্যাপী সহিংসতা সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য একটা অজুহাত তৈরি করতে পারেন। কঠিন এই পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত জানিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা যেমন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, তেমনি প্রস্তুত সংলাপের জন্যও।
বিক্ষোভে বিপর্যস্ত ইরানের সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব একটা সমর্থন পাচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশটির পাশে এসে দাঁড়িছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, আমরা সর্বদা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছি এবং ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করেছি যে সমস্ত জাতির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। আমরা সকল পক্ষকে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আরও বেশি কিছু করার আহ্বান জানাই। এদিকে দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সরকারবিরোধীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর হাত থেকে বিক্ষোভকারীদের বাঁচানোর যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তার রক্ষায় দেরি করলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর উপদেষ্টাদের কাছ থেকে এখন পরস্পর বিরোধী পরামর্শ পাচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, ওয়াশিংটন এখন বড় কোনো পদক্ষেপ নিলে, ইরান সরকার এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চালানো ‘ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রচার করে বিক্ষোভ দমনের সুযোগ নেবে।
ট্রাম্প কথা দিয়েছিলেন, ইরানী বাহিনী বিক্ষোভকাপরীদের ওপর হামলা চালালে তিনি ইরানে ‘গুলি চালাবেন’। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাচ্ছে। ট্রাম্পের দলের কাছে কোনো গোছানো পরিকল্পনা নেই। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বড় কোনো নড়াচড়া এখনো দেখা যায়নি। কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বন্ধুদেশ ট্রাম্পকে আপাতত শান্ত থাকতে বলছে। নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের সামনে এখন সামরিক শক্তিপ্রয়োগ এবং অন্যান্য বিকল্প তুলে ধরা হচ্ছে। গত শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও এনিয়ে কথা বলেছেন।
তেহরানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস। এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিমান হামলা চালানো বেশ কঠিন। কারণ, এতে বেসামরিক মানুষের ব্যাপক মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। গত জুনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় তেমন প্রমাণ রয়েছে। সে সময় এক হাজারের বেশি সাধারণ ইরানী নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। ফলে তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জেগে উঠেছিল। এদিকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া ইরানের সাবেহ শাহ-এর ছেলে রেজা পাহলভিও ট্রাম্পকে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। চলমান বিক্ষোভে তাঁর অনুসারীরাও অংশ নিচ্ছেন। তবে বাইরের অনেক পর্যবেক্ষক ট্রাম্পকে সাবধান করে বলেছেন, ট্রাম্পের বোমাবর্ষণ উল্টো ফল দিতে পারে। ইরান বিষয়ক সাবেক শীর্ষ ইসরাইলী প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, আসল প্রশ্ন হলো- ট্রাম্প যদি উত্তেজনা এড়ানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে তা কি বিক্ষোভ দমনে সরকারকে থামাতে পারবে? নাকি উল্টো ফল দেবে। কারণ, ইরানের বিরোধী শিবিরের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের আরও গভীর ও দৃঢ় হস্তক্ষেপের প্রত্যাশা করছেন।
চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল মনে করেন, মার্কিন হস্তক্ষেপের ফলে ইরান সরকারের ভেতরের বিভেদ দূর হয়ে তারা সবাই এক হয়ে যেতে পারে। এদিকে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ ইসফান্দিয়ার বাতমানঘেলিদজ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন, গাজা বা ভেনিজুয়েলায় শান্তি ফেরাতে পারেনি। আসলে তাদের হাতে শক্ত কোনো কৌশল নেই। যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত রব ম্যাকায়ার বলেছেন, মার্কিন হামলা হয়তো মানুষের প্রত্যাশা মতো কাজ করবে না। তাঁর মতে, ট্রাম্পের কথা ও কাজের মধ্যে একটা বড় ফাঁক তৈরি হতে যাচ্ছে। এদিকে ইরান সরকার মানুষকে বোঝাতে চাইছে, বিদেশিরা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। গত রোববার টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বলেন, বাইরের শত্রুরা দাঙ্গাবাজদের উসকে দিচ্ছে। প্রেসিডেন্টের মতে, ৮০ শতাংশ বিক্ষোভকারীর অভাব-অভিযোগ সঠিক থাকলেও যারা মসজিদ বা দোকানে আগুন দিচ্ছে, তারা সন্ত্রাসী। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতিকে অস্ত্র বানিয়ে ইরানকে নতজানু করতে চায়। তিনি দেশবাসীকে সরকারের পাশে থাকার আহ্বান জানান। ইরানী জনগণ তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নেমে এসেছে রাজপথে। এদিকে ঘোড়ায় চড়েও দ্বিধায় পড়ে গেছেন ট্রাম্প। আসলে আগ্রাসনের কাজটা সব সময় সহজ হয়ে ওঠে না।