সমাজে, কলকারখানায়, রাজনীতিতে সব কিছু সরলভাবে চলে না। ষড়যন্ত্র ও চাতুর্যের চিত্র আছে এসব অঙ্গনে। সত্য নয়, ক্ষুদ্র স্বার্থই এখানে বড় কথা। কখনো কখনো ধর্মকে ব্যবহারেও কুণ্ঠিত হয় না ক্ষমতাবানরা। পত্রিকান্তরে ২১ ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তিগত বিরোধ ও শ্রমিক অধিকার আন্দোলনকে ধর্মীয় উসকানির রূপ দিয়ে ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে (২৭) হত্যা করা হয়েছে। ওই যুবকের পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ও অনুসন্ধান সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। উল্লেখ্য, দিপু ময়মনসিংহের জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের শ্রমিক ছিলেন। তিনি তারাকান্দি উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী এটি হঠাৎ উত্তেজিত জনতার কোনো ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তৈরি করে দিপুকে হত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর নিহতের ভাই বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয়ে অন্তত ১৫০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ইতিমধ্যে র্যাব-১৪ ও জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা যায়, দিপু চন্দ্র দাস দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। উৎপাদন বাড়ানো, ওভারটাইম, কাজের পরিবেশ ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দিপু কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতেন। এতে মালিক পক্ষের সাথে তার বিরোধ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ কারণে তাকে দীর্ঘদিন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এক পর্যায়ে শুরু হয় কারখানা থেকে বের করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। নিহতের পরিবার জানায়, গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে দিপুকে জোরপূর্বক চাকরি ছাড়তে চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাকে ধর্ম অবমাননার ঘটনায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়। পরে ওই হুমকিই বাস্তবায়ন করা হয়।
জানা গেছে, ঘটনার দিন কারখানার ভেতরে শুধু হুমকি নয়, মারধরও করা হয় দিপুকে। এরপর কর্তৃপক্ষের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি চক্র বাইরে প্রস্তুত থাকা লোকদের খবর দেয়। এরপর কারখানার সামনে শুরু হয় স্লোগান ও বিক্ষোভ। এমন পরিস্থিতিতে কারখানা কর্তৃপক্ষ থানা পুলিশকে অবহিত না করে মূল গেট খুলে দেয় এবং দিপু চন্দ্র দাসকে তথাকথিত বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে তুলে দেয়। এরপর একদল লোক তাকে পিটিয়ে হত্যা করে এবং লাশ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনার পর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক প্রায় দু’ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এদিকে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, যাদের ‘বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাদের কেউই ঘটনাস্থলের আশেপাশের বাসিন্দা নন।
এলাকার রাজনৈতিক মহল ও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভালুকা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও আসন্ন নির্বাচনে এমপি প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু বলেন, এত দ্রুত শতাধিক লোক সংগঠিত হওয়া স্বাভাবিক বিষয় নয়। এখানে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে। ধর্ম অবমাননার ইস্যু তৈরি করে দেশকে অস্থিতিশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করতে কোনো মহল এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এদিকে ময়মনসিংহ জেলা জামায়াতের আমীর আব্দুল করিম বলেন, ঘটনাটিতে ষড়যন্ত্রের আভাস স্পষ্ট। দেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করতেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। সত্য উদঘাটনে তিনি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। পাইওনিয়ার নিটওয়্যারসের মালিক বাদশা মিয়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, শেখ হাসিনার শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি ভালুকায় একরের পর একর বনভূমি দখল করে শিল্প-সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। স্থানীয়দের মতে, বাদশা মিয়া দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, শ্রমিকদের অধিকার-আন্দোলন দমন, নিজের শিল্প-স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির ষড়যন্ত্র হিসেবে দিপু চন্দ্র দাসকে হত্যা করা হতে পারে। আমরা আশা করবো, সরকার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে উদ্যোগ নিয়ে বিষয়টি দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট করবে। এখানে ভয়ংকর বিষয় হলো, মানুষ হত্যায় ধর্মের ব্যবহার, যা ইসলামে বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। আমরা অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দাবি করছি। দিপু দাসের পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি যেন গুরুত্বের সাথে দেখা হয়।