১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট। নির্বাচন এবং গণভোটের সাথে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা এবং নতুন স্বপ্ন। জুলাই আমাদের নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে। অথচ একটি রাজনৈতিক মহল জুলাই অভ্যুত্থানকে তেমন গুরুত্ব দিতে চান না, বিপ্লবী তরুণ সমাজকেও তারা অবজ্ঞা করতে চান। অথচ এদের কারণেই এই অভিজাত শ্রেণি এখন রাজনীতি করতে পারছেন, ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নও তারা দেখছেন। জনদরদি রাজনীতিক ও ক্ষমতালোভী রাজনীতিকের মধ্যে তফাৎ অনেক। জনদরদি রাজনীতিক কখনো জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না, তরুণ বিপ্লবীদের অবদানকে খাটো করে দেখতে পারে না।বাংলাদেশের দেয়ালে দেয়ালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে যে গ্রাফিতি অঙ্কিত হয়েছে, তা নতুন বাংলাদেশের ঘাম ও রক্তভেজা সংবিধান। এ সংবিধানকে অস্বীকার করে কিছু হতে পারবে না নতুন বাংলাদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে এখনো শোভা পাচ্ছে গণআকাক্সক্ষার গ্রাফিতি। কোনোটায় দাবি, কোনোটায় ক্ষোভ, কোনোটায় হাস্যরস, কোনোটায় স্বপ্ন, কোনোটায় আবার হুঁশিয়ারিÑ এভাবেই অঙ্কিত হয়েছে জাতির আশা-আকাক্সক্ষার মহাকাব্য। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল জেনারেশন জেড বা জেন-জি। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ছিল জেন-জির দ্রোহ। তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং বঞ্চিত জনতা। যাবতীয় শোষণ, বৈষম্য ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ছিল জুলাই যোদ্ধাদের সাহসী উচ্চারণ। এই উচ্চারণকে যারা ধারণ করে এগিয়ে যাবে, তাদের জন্যই আগামীর বাংলাদেশ।

জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। তবে সবাই সে সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছেন না। অনেকেই এখনো পুরনো রাজনীতিতে মশগুল। তারা প্রভুদের শেখানো ‘৭১ কার্ড’, ‘মৌলবাদী কার্ড’ নিয়ে খেলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তা জেন-জিদের মধ্যে কাজ করছে না। ওরা নতু থিমে, নতুন শৃঙ্খলায়, নতুনভাবে দেশ গড়তে চায়। আর যারা প্রবীণ তারাও বিগত সময়ের রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার চিত্রে তিতবিরক্ত। তারা জানেনÑ দুর্নীতি, চাঁদাবাজির পরিবর্তে এখন প্রয়োজন ত্যাগের রাজনীতি এবং নৈতিক মানদণ্ডের প্রশাসন। অর্থাৎ এখন জাতি পরিবর্তনের এক মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবর্তনের এই আকাক্সক্ষা দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদদের জন্য এক বড় সুযোগ। তবে ইতিহাসের সত্য হলো, সবাই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেন না। এর জন্য প্রয়োজন হয় গভীর দেশপ্রেম, জনতার প্রতি ভালোবাসা এবং মহান স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার চেতনা। এমন বাস্তবতায় গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এটা দলীয় নেতা-কর্মীদের বিশ্লেষণ নয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বিষয়টি উঠে এসেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে অতীতে জামায়াতে ইসলামীকে এড়িয়ে চলার মতো লোকের সংখ্যাই ছিল বেশি। জুলাই বিপ্লব সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এখন দেশের অভিজাত মহল থেকে শুরু করে বিদেশী কূটনীতিকÑ সবাই লটির প্রধান ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার মতে, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপে শীর্ষ অবস্থানের জন্য হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জামায়াত এগিয়ে আসায় অভিজাত মহলের দৃষ্টিভঙ্গিতে দৃশ্যমান এ পরিবর্তন আসে। সম্প্রতি জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান একটি উচ্চাভিলাষী নির্বাচনী ইশতেহার উন্মোচন করেন। ঢাকার অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ এই ইশতেহার বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিশ্লেষকরা বলেন, জামায়াতের নেতৃত্বের কাছে এই ইশতেহারের মূল উদ্দেশ্য আর্থিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে বরং তাদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরা।

দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচকরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতকে এমন একটি দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, যারা ধর্মীয় মতাদর্শের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। যাদের তরুণ, বৈচিত্র্যময় ও ভবিষ্যতমুখী জনগোষ্ঠীকে শাসন করার সক্ষমতাপ নেই। কিন্তু নতুন ইশতেহারটি একটি নতুন চিত্র উপস্থাপন করেছে। যেখানে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলকে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে, তাদের ধর্মীয় ভিত্তি ও আধুনিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আকাক্সক্ষার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। গত কয়েক মাসে ইউরোপীয়, পশ্চিমা; এমনকি ভারতীয় কূটনীতিকরাও ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা করেছেন। অথচ এই একই ব্যক্তি অল্প কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকের কাছে তেমন আকর্ষণীয় ছিলেন না।

সমাজে, রাজনীতিতে প্রোপাগান্ডা থাকে, ব্লেমগেম থাকে। যারা ক্ষমতায় থাকেন, শাসন করেনÑ তাদের কায়েমী স্বার্থ থাকে। এই স্বার্থের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে, রাজনৈতিক বক্তব্য রাখলে ক্ষমতাসীনরা ক্ষুব্ধ হন। তার প্রকাশ ঘটে জেল-জুলুমে, প্রোপাগান্ডায়, মিথ্যা বয়ানে। জামায়াতে ইসলামী এমন রাজনীতির শিকার হয়েছে। এখান থেকে উঠে আসতে হলে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করার পাশাপাশি উন্নত কর্মকাণ্ডের উদাহরণ তুলে ধরতে হয়, দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। জামায়াত তেমন কর্মসূচি নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই হয়তো এবারের সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী কুষ্ণ নন্দী বলেন, যখন কোনো পরিবার দারিদ্র্যে পড়ে, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কল্যাণমূলক নেটওয়ার্ক তখন ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না এনে তাদের পাশে দাঁড়ায়। মানব সেবার এমন দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে জামায়াতের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। অযথা জামায়াতের প্রশংসা করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং মন্দ রাজনীতির তথা ব্লেমগেমের রাজনীতির মোকাবেলায় ইতিবাচক রাজনীতি করে কিভাবে এগিয়ে যেতে হয় তেমন উদাহরণ তুলে ধরাই উদ্দেশ্য।

রাজনীতির কথা অনেক হয়েছে, এখন ভোটের কথা বলি। আমরা যারা ভোট দেই, তারা তো আসলে সাক্ষ্য দেই। আমাদের সাক্ষ্যটা কি সব সময় সঠিক হয়, সত্যের পক্ষে হয়, আমাদের চাওয়ার অনুকূলে হয়? এখানে ভুল হলে আমাদের ভোট ভুল হবে, এমপি ভুল হবে। এতসব ভুল হলে আমাদের স্বপ্ন পূরণ হবে কেমন করে? বিগত সময়ে আমরা এমন ভুলের চর্চা করেছি। মাত্রা বৃদ্ধির কারণে আমরা অবশেষে পেয়েছি এক ফ্যাসিবাদী সরকার। এ সরকারের অধীনে আমাদের জীবন কেমন কেটেছে, তা বর্ণনার বোধ হয় আর প্রয়োজন নেই। জগদ্দল পাথর সরানোর জন্যই তো দেশে হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থান। অভ্যুত্থানের লক্ষ্য অর্জনেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। নির্বাচন উপলক্ষে নানা বয়ান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে যারা ভোটের সাক্ষ্য দেবেন, তারা যেন বয়ান কিংবা অভিনয়ের ভেলকিতে আবার বিভ্রান্ত হয়ে না যান। বয়ানের পেছনের মানুষটিকে ভালো করে পরখ করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্ধ আবেগ, দেশী-বিদেশী কার্ড, ঈর্ষা এবং ক্ষুদ্র স্বার্থ যেন আমাদের বিভ্রান্ত করতে সমর্থ না হয়। যারা চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, যারা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের কল্যাণের কথা বলছেন, যারা নারীদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেনÑ তাদের অতীত আমলের দিকে আমাদের একটু ফিরে তাকাতে হবে। ভেবে দিতে হবে মূল্যবান ভোট। এ ভোট কোনো সাধারণ মতামত নয়, এটা সাক্ষ্য। সাক্ষ্য প্রদান বড় দায়িত্বের বিষয়। জেনেশুনে যদি আমরা কোনো ভুল মানুষকে ভোট দেই, তার দায় অবশ্যই আমাদের বহন করতে হবে। এই দায় শুধু ইহকালের নয়, পরকালেরও বটে। আশা করবো জুলাই অভ্যুত্থানের দিনগুলো আমাদের স্মৃতিতে আছে। ছাত্র-জনতার, শিশুদের রক্তের দায় আমাদের শোধ করতে হবে। আহত ও পঙ্গু জুলাইযোদ্ধাদের ডাক আমাদেরু শুনতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমরা যেন জুলাইযোদ্ধাদের পতাকাকেই উড্ডীন রাখতে পারি।