আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে আসমান ও জমিন। তবে জমিনের কথাই আমরা বেশি বলি। জমিনে আমরা বাস করি, জমিনে আবার ফসলও ফলাই। ফসল শুধু সম্পদ নয়, মনোহরও বটে। ফসল দেখলেই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। বাতাসে যখন ধান বা গমের শীষ দোল খায়, তখন প্রকৃতির চিত্রটা ভিন্নমাত্রা পায়। এখানে একটু জ্ঞানের কথা বলি, আমরা যারা ফসল ফলাই তারাই কি শুধু খাবো? এতে কি ভুখা-নাঙ্গা তথা হতদরিদ্রদের কোন হক নেই? হক আছে, স্রষ্টা, তেমন নির্দেশ দিয়েছেন- যার নাম ‘ওশর’। বিশ্বাসীরা ওশর দিয়ে থাকেন। অবিশ্বাসীর কথা আলাদা। তারা তো স্রষ্টার বিধান মানেন না। আর ওশর তো হলো ফসলের যাকাত।

ফসলের কথা বলছিলাম। ফসলের জন্য প্রয়োজন হয় জমিনের। ভালো ফসল পেতে হলে জমিনকে ফসলের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হয়। গড়ার কাজটাই আসল। এখানে ঋতুর জ্ঞান থাকতে হয়, মাটির পরিচয় জানতে হয়। তারপর কর্ষণের সাথে সাথে আবর্জনাও বাছতে হয়। সময় চলে আসে চারা রোপণ কিংবা বীজ বপনের। তারপর সময়ের সাথে সাথে আরও অনেক কাজ- সার, সেচ, আগাছা পরিষ্কার, কত কিছু। স্রষ্টার দয়ায় আলো-বাতাস ও পরিমিত বৃষ্টি পেলে ফসলে বরকত হয়, কৃষকের মুখে ফুটে ওঠে হাসি। হাসে দেশ এবং দেশের মানুষও। কৃষির সাথে জমিনের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক বিষয়।

এতক্ষণ আমরা ফসল ও জমিনের কথা বলছিলাম। ‘মানব জমিন’ বলেও একটা কথা আছে। ভালো ফসলের জন্য যেমন ভালো জমিন প্রয়োজন, তেমনি ভালো সমাজের জন্যও প্রয়োজন ভালো ‘মানব-জমিন’। এখানেও আমরা গড়ার কথা বলছি। ফসলের জন্য জমিন প্রস্তুত থাকে না, প্রস্তুত করতে হয়। কাক্সিক্ষত সমাজের জন্য মানব-জমিন প্রস্তুত থাকে না, প্রস্তুত করতে হয়। এখানেও কর্ষণের কাজ আছে, রোপণ-বপন, সেচ ও আগাছা বাছাইয়ের কাজ আছে। আমরা এ কাজগুলো করছি কী? না করলে ভালো মানব-জমিন হবে না, হবে না ভালো সমাজ কিংবা রাষ্ট্রও।

আমরা যখন রাষ্ট্রের কথা বলি, তখন শাসনামলের কথাও বলি; অর্থাৎ কার শাসন কেমন ছিল সেই কথা। গত দেড় বছর এনিয়ে অনেক কথা হয়েছে বাংলাদেশে। শেখ হাসিনার শাসন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শাসন নিয়ে কথা হওয়ারই কথা। হাসিনার আমলে গুম-খুন, জুলুম-নির্যাতন, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, ব্যাংক-বীমা ধ্বংস, অর্থ পাচারসহ এমন সব অজাচার ও অনাচার হয়েছে; যা মানুষের কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এর অর্থ দাঁড়ায়, ফ্যাসিস্টরা অমানুষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের কাজে দেশ, দেশের মানুষ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও বস্তুজগৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি, রুচি এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ভুবনও।

এসবের বিরুদ্ধেই তো ছিল জুলাই বিপ্লব, জুলাই অভ্যুত্থান। অভ্যুত্থানতো হলো, কিন্তু অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের কাজটাতো বক্তৃতা-বিবৃতির মতো কোনো সহজ কাজ নয়। এখানে সময়ের হিসাব আছে, রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যের হিসাব আছে, আছে আঞ্চলিক ও ভূরাজনীতির হিসাবও। এতোসব হিসাবের মধ্যে দেশ ও জনতার স্বার্থের পতাকা উড্ডীন রেখে পথ চলা শুধু কঠিন নয়, বিপদসঙ্কুলও বটে। ক্ষমতা ও ব্লেমগেমের রাজনীতি করে বিপদসঙ্কুল এ পথের পথিক হওয়া যায় না। এজন্য গভীর দেশপ্রেমের সাথে প্রয়োজন হবে দৃঢ় নৈতিক মেরুদণ্ড। পরকালে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী মানুষরা বিপদসঙ্কুল এ পথের পথিক হতে পারেন। তবে লেবাসধারীরা ঝরে পড়বেন নিশ্চিতভাবেই। এটা ইতিহাসের সত্য।

১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা লক্ষ্যণীয়। অনেকের তৎপরতাই জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সাথে যায় না। কেউ কেউতো দল ও আদর্শ ত্যাগ করে ক্ষমতার টিকেট চেয়েছেন। ক্ষমতার লিপ্সায় বিভ্রান্ত রাজনীতিকরা শুধু প্রতিপক্ষকে নয়, নিজ দলের নেতাকর্মীদের হত্যায়ও কুণ্ঠিত নয়। প্রতিপক্ষের চরিত্র হননে মিথ্যাচার তো চলছেই। গোয়েবলসরা যেন আবার ফিরে এসেছে বাংলায়। বড় দলেও শৃঙ্খলার বালাই নেই। এমপি হওয়ার জন্য দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছেন, স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনে লড়ছেন।

প্রশ্ন জাগে, দলের আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রতি কি তাদের কোনো সম্মান নেই? না কি দল সম্মানজনক অবস্থায় অধিষ্ঠিত নেই? জুলাই আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহঅবস্থানের সৌন্দর্য ছিল। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যছিল। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সবাই ছিল সোচ্চার। এখন দৃশ্যপটে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষয়গুলো জনগণের বিবেচনায়ও আছে। ভোটের দিন হয়তো তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে শপথ করেছিলেন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা, তা এখনো ঠিক আছে তো? অনেকের কর্মকাণ্ড দেখে তো প্রশ্ন জাগে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতা থাকে, প্রতিহিংসা নয়। তাহলে জামায়াত নেতাকে প্রহারে প্রহারে হত্যা করা হলো কেন? এটাতো কোনো বড় দলের কাজ হতে পারে না। এতে ভোট বাড়ে না কমে? বিষয়টা বড় দলের বড় বড় নেতারা ভেবে দেখতে পারেন। যারা দেশ শাসনের দাবীদার, ভোটের রাজনীতিতে তাদের আচরণ যৌক্তিক ও গণতন্ত্রসম্মত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এদিকে অনেকেরই খেয়াল নেই। ভোটের উত্তেজনায় কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেললে, দেশ শাসনে যোগ্যতার প্রমাণ দেবেন কেমন করে? ভোটের জনসভায় বিষোদগার ও ব্লেমগেমের বদলে নিজেদের কথাই তো বেশি বলা উচিত। কিন্তু অনেকেই এই উচিত কাজটি করতে সক্ষম হচ্ছেন না। মানুষ বিষোদগার নয়, শুনতে চায় কাজের কথা; অর্থাৎ দেশের জন্য; মানুষের জন্য কি করবেন সেই কথা। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে যারা ব্লেমগেমের রাজনীতি করছেন, তারা আসলে প্রতিপক্ষকে সাহায্য করছেন। তাদের তৎপরতায় প্রতিপক্ষের নাম ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে এবং তৈরী হচ্ছে আগ্রহ। এখন প্রতিপক্ষ যদি ঠাণ্ডামাথায় ব্লেমগেম ও দোষারোপের তথ্যভিত্তিক জবাব দিয়ে দেন, তাহলে তাদের সমর্থক সংখ্যা বেড়ে যাবে। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের এ বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, ‘প্রোপাগাণ্ডার’ চাইতে ‘তথ্য’ অনেক বেশি শক্তিশালী। দেশের রাজনীতি মান উন্নয়নে এ ব্যাপারে সচেবতনতা কাম্য। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, জুলাই বিপ্লবের পরেও অনেকেই পুরোনো রাজনীতি তথা ফ্যাসিবাদী বয়ান থেকে সরে আসতে সক্ষম হননি। পরিশ্রম ও ত্যাগের রাজনীতির বদলে এখনো অনেকেই বিষোদগার ও ব্লেমগেমের সস্তা পথে চলতে চান। কিন্তু এ পথে না হবে দেশের উন্নতি, না হবে ভোটবৃদ্ধি। তরুণ প্রজন্ম নেতিবাচক এই রাজনীতিকে ‘না’ বলে দিয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচন-এর বড় প্রমাণ। দেশের সাধারণ মানুষ ও নেতিবাচক তথা ব্লেমগেমের রাজনীতি পছন্দ করেন না। তারপরও দেশের বড় রাজনৈতিক দলকেও ‘৭১ কার্ড’ নিয়ে খেলতে দেখা যাচ্ছে। দেশের মানুষ জানে, ভারতের পরামর্শে ফ্যাসিস্ট হাসিনা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে জাতিকে বিভক্ত করে রেখেছিল। এই সযোগে ভারত যা যা চেয়েছে তা পেয়ে গেছে এবং হাসিনা সরকারের জন্য দেওয়ার কাজটাও বেশ সহজ হয়ে উঠেছিল। আসলে বিভক্ত জাতি নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, এগিয়ে যাওয়া তো অনেক দূরের কথা। তাই প্রশ্ন জাগে, জুলাই বিপ্লবের পরে এবং নির্বাচনের আগে ‘৭১ কার্ড’ নিয়ে বিভেদের রাজনীতিটা আবার কাদের পরামর্শে শুরু হলো? আর কারা এই পরামর্শের কাছে মাথা নত করলো? মাথা নত করার তো একটা প্রাপ্তি আছে। সেই প্রাপ্তিটা কি, ক্ষমতা প্রাপ্তির আশ্বাস নয়তো?

লেখার শুরুতে আমরা ফসলের জামিনের কথা বলছিলাম, বলছিলাম মানব জমিনের কথাও। ভালো ফসল পেতে হলে যেমন জমিনকে উপযোগী করে গড়ে তুলতে হয়, তেমনি ভালো সমাজ পেতেও প্রয়োজন ভালো মানব-জমিন। এখানেও গড়ার কাজটাই আসল। এই আসল কাজটি বাদ দিয়ে, মানুষ গড়ার কাজটি বাদ দিয়ে, রাজনৈতিক দল যদি শুধু ভোটের মানুষ তৈরি করেন, ভোটের রাজনীতি করেন; তাহলে দেশগড়ার কাজ হবে না, জুলাই বিপ্লবের স্বপ্নও পূরণ হবে না। দেশে এখনো ভুল পথের রাজনীতি চলছে, এ পথেই প্রবেশ করছে ফ্যাসিবাদের দোসররা, প্রবেশ করছে ‘স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ’ তত্ত্বের অনুচররা। ফলে আওয়ামী বয়ানের ফুল আবার ফুটতে শুরু করেছে। জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার ত্যাগের কথা ভুলে গেলে, শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলে, নব্য-আওয়ামী লীগ হতে আর কতক্ষণ। আধিপত্যবাদী শক্তিতো মালা হাতে দাঁড়িয়েই আছে। অতএব সাবধান, ছাত্র-জনতা সাবধান, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটাররা সাবধান।