‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’। গানের এ ভাষা আমাদের প্রিয় ভাষা। তবে গানের জগতের সাথে বাস্তব জীবনের তেমন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনো মিল খুঁজে পেলে আমরা আনন্দিত হই, আশাবাদী হই। তেমন এক আশাবাদের খবর মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় প্রায় সব সড়কের দৃশ্য এখন অন্যরকম। সড়কের দু’পাশজুড়ে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছ। পিচঢালা পথ সবুজ ছায়ায় ঢাকা। যতদূর দৃষ্টি যায়, নির্মল প্রকৃতির ছোঁয়া। কোলাহলমুক্ত সড়কে শোনা যায় পাখির ডাক। হরিপুর উপজেলায় বদলে যাওয়া এ দৃশ্যের পেছনে রয়েছে একদল উদ্যমী তরুণ। তারা গড়ে তুলেছেন ‘অক্সিজেন’ নামের একটি সংগঠন। নগর ও গ্রাম সবুজায়নের পাশাপাশি তারা শিক্ষা ও মানবতার সেবায় কাজ করছেন। সীমান্তবর্তী গ্রামের কোনো শিশুর পড়ার জায়গা নেই, কোনো প্রবীণ অক্ষর চিনতে পারেন না কিংবা কোনো অসহায় মানুষের থাকার জায়গা নেই, তাদের জন্যই অক্সিজেন-এর যাত্রা শুরু।

প্রথমে নিজেদের শ্রম আর সামান্য অর্থ দিয়ে অক্সিজেন গড়ে তোলে হরিপুর উপজেলার প্রথম পাঠাগার। এরপর পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীবনের সহায়ক হয়ে ধীরে ধীরে ‘অক্সিজেন’ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছে। ২০১৭ সালের ২৬ মার্চ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে ৭৫ সদস্য নিয়ে অক্সিজেন-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ২০২০ সালের ২৬ মার্চ গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর থেকে পাঠাগারের নিবন্ধন দেওয়া হয়। বর্তমানে পাঠাগারটিতে বইয়ের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। এখন পর্যন্ত তারা দু’হাজার ৫০০ কৃষ্ণচূড়া, ৫০০ নিম গাছ ও ১২ হাজার তালের বীজ বপন করেছেন। শুধু বীজ বপন নয়, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার আলো ছড়াতেও কাজ করছে সংঘঠনটি। গড়ে তুলেছে ‘অক্সিজেন লোকস্মৃতি জাদুঘর’। এটি এলাকার ঐতিহ্য ও বিলুপ্ত স্মৃতি সংরক্ষণ করছে। এছাড়া অসচ্ছল ব্যবসায়ীদের জন্য দোকান, দুস্থদের জন্য ভ্যানগাড়ি, গৃহহীনদের জন্য আবাসন এবং সুপেয় পানির জন্য নলকূপ বসানোর কাজও তারা করে যাচ্ছেন। এছাড়া নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিন প্রশিক্ষণ ও বিতরণ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, অক্সিজেনের বড় কার্যালয় কিংবা সুবিধাভোগী নেতৃত্ব নেই। এটি সাত সদস্যের নির্বাহী কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অক্সিজেনের সভাপতি মোজাহেদুল ইসলাম ইমন বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, সমাজ পরিবর্তনের মূল শক্তি হলো সচেতনতা, মানবতা ও সংস্কৃতির যৌথ বিকাশ। তিনি জানান, অক্সিজেনের শুরুটা সহজ ছিল না। স্থানীয়দের অনেকে প্রথমে একে ‘ধান্দবাজি’ বলে কটাক্ষ করতেন। কিন্তু তারা থামেননি। গত কয়েক বছরে ৩৫ হাজার ৮৫০ জন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পাঁচটি ঘর নির্মাণ, ৩৭টি টিউবওয়েল স্থাপন এবং পাঁচ হাজার মানুষের একবেলা আহারের ব্যবস্থা করে তারা মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। সংগঠনটির তহবিল ও লোকবল সংকট রয়েছে। অনেক সময় কাজ করতে গিয়ে সদস্যদের পকেট ফাঁকা হয়েছে, তবুও তারা থামেননি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামন সাগর বলেন, ‘সব বাধা পেরিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আর্থিক সহযোগিতা পেলে আমাদের কাজ আরও ত্বরান্বিত হবে।’ তরুণদের সংগঠন ‘অক্সিজেন’-এর কার্যক্রম আমাদের আশাবাদী করেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অতীতেও আমরা এ ধরনের কার্যক্রম লক্ষ্য করেছি। তবে নৈতিক চেতনা ও ব্যবস্থাপনাগত যোগ্যতার অভাবে অনেক সংগঠন টিকে থাকতে পারেনি। আমরা আশা করবো, ‘অক্সিজেন’ কর্মগুণে সাফল্যলাভে সক্ষম হবে।