বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। জাতিসংঘের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হকের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে- সংস্থাটি বাংলাদেশের নির্বাচনকে নিছক একটি ভোটগ্রহণের দিন হিসেবে দেখছে না; বরং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। তাঁর বক্তব্যে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে, তা হলো-নিরাপত্তা, শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-এ তিনটি উপাদান ছাড়া কোনো নির্বাচনই আন্তর্জাতিক মানদ-ে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ বার্তাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, ভীতি, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগ বারবার উঠেছে। ফলে নির্বাচনকালীন পরিবেশ নিয়ে কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের বক্তব্য সে উদ্বেগেরই কূটনৈতিক প্রতিফলন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-জাতিসংঘ কেবল নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি নয়, নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখার বিষয়টি সামনে এনেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। কারণ প্রকৃত গণতন্ত্রের পরীক্ষা শেষ হয় না ব্যালটবাক্স বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে; বরং ফল ঘোষণার পর বিরোধী কণ্ঠ, নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা কীভাবে রক্ষা করা হয়Ñসেখানেই এর আসল মানদ- নির্ধারিত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এটি একটি স্পষ্ট দায়িত্বের বার্তা। নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব কেবল প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক নয়; এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বও। রাষ্ট্রযন্ত্রকে এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে কেউ ভোট দিতে গিয়ে ভয় না পায়, মত প্রকাশ করতে গিয়ে শঙ্কিত না হয় এবং নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তা দমনমূলক ব্যবস্থার মুখে না পড়ে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও এই বার্তা প্রযোজ্য। নির্বাচনকে ‘জয়-পরাজয়ের যুদ্ধ’ হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা হিসেবে গ্রহণ করাই হবে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কল্যাণকর। সহিংসতা, উসকানি ও বিভাজনের রাজনীতি শুধু আন্তর্জাতিক আস্থাই নষ্ট করে না, দীর্ঘমেয়াদে দেশের ভেতরের স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করে।
জাতিসংঘ কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলছে নাÑএটি পরিষ্কার। তারা যে কথাটি বলছে, সেটি আসলে বাংলাদেশের সংবিধান, জনগণের আকাক্সক্ষা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ। এখন প্রশ্ন হলো-আমরা এ সুযোগকে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথে ব্যবহার করতে পারবো, নাকি আবারও সন্দেহ ও বিতর্কের আবর্তে পড়ে যাবো? এ মুহূর্তে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকল মহলের দায়িত্বশীল আচরণ, যথাযথ রাষ্ট্রচর্চা, সংযত রাজনৈতিক আচরণ এবং নাগরিক অধিকারকে কেন্দ্র করে আস্থা পুনর্গঠনের সদিচ্ছা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কোনো চাপ নয়-বরং এটি হতে পারে একটি সুযোগ। শেখ হাসিনার শাসনামলে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে দুর্নাম হয়েছিল তা হটিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আবারও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার এবারই সুবর্ণ সুযোগ।