সংবাদপত্র জগতে ‘এডিটরিয়াল পলিসি’ বলে একটি কথা আছে। সম্পাদকীয় নীতিমালার আলোকেই পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ নীতিমালা নিয়ে দেশে-বিদেশে নানাপ্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর কারণ নীতিমালার ব্যত্যয় এবং ব্যত্যয়। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের সময় আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ ব্যত্যয়ের ঘটনা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সেখানকার কোনো কোনো গণমাধ্যমে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক খবর প্রকাশের পাশাপাশি উগ্র বয়ানও লক্ষ্য করা গেছে। সাম্প্রদায়িকতার কার্ড নিয়ে তাদের তৎপরতা ছিল বেশি। বাংলাদেশসহ বিশ্বমিডিয়ায় তাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার পর প্রোপাগাণ্ডায় কিছুটা ভাটা পড়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভাতীয় সংবাদমাধ্যমে আবার মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা কোনো দেশের সংবাদমাধ্যমের পলিসি হতে পারে না।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত ১৭ জানুয়ারির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি সুস্পষ্ট ও একপাক্ষিক রাজনৈতিক বয়ান লক্ষ্য করা যায়। এসব প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানকে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ফর্স্টপোস্ট-এর পালকি শর্মা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আনন্দবাজার পত্রিকা ও রিপাবলিক বাংলা যেভাবে জামায়াতকে উপস্থাপন করছে, তাতে তাদের বিশেষ উদ্দেশ্য আর গোপন থাকছে না। এসব সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চায়। অথচ বাংলাদেশের মানুষ এমন কোনো চিত্র লক্ষ্য করছে না। অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবির পরপর পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেলেও ভারতীয় গণমাধ্যম এ বিপুল সমর্থনের যৌক্তিক প্রচার না করে বরং বিষয়টিকে ‘র‌্যাডিক্যালাইজেশন’ বা উগ্রবাদের বিস্তার হিসেবে প্রোপাগাণ্ডা চালাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয়কে গণতান্ত্রিক বিকাশের অভিযাত্রা হিসেবে বিবেচনা করছে।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের একজন অধ্যাপক বলেন, বাংলাদেশে চব্বিশের অভ্যুত্থান হয়েছিল চিরাচরিত রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে চুরমার করে নতুনের বিজয় কেতন ওড়ানোর জন্য। কিন্তু ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী গণমাধ্যম সেই পুরোনো ন্যারেটিভেই ফিরে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ ও পুরো ভারতের গণমাধ্যম, এমন কি কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গণমাধ্যমও সেই পুরোনো একাত্তর কার্ড খেলছে। জামায়াতকে বিচার করা হচ্ছে একাত্তর দিয়ে। তিন আরও বলেন, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এ প্রচারণার আরো গভীর উদাহরণ পাওয়া যায়, যখন তারা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধমূলক ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। এমন প্রবণতাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশিষ্ট কূটনীতিক রিয়াজ আহমেদ বলেন, দিল্লি এখন মরিয়া হয়ে বাংলাদেশে তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে চাইছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর তারা বিএনপিকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, কিন্তু জামায়াত তাদের কাছে সবসময়ই ‘রেড লাইন’। তাই মিডিয়ার মাধ্যমে জামায়াতকে দানবীয়ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে বিএনপি তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বা আল জাজিরার দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রচারনার বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ক্ষমতার পটরিবর্তনের পর জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিষয়টিকে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখিয়েছে। অন্যদিকে আল জাজিরা বারবার তুলে ধরেছে যে, গত দেড় দশকে জামায়াতের ওপর যে অবর্ণনীয় দমন-পীড়ন চলেছে, তার ফলে দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে সহানুভূতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক এ গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি, সেখানে ভারতীয় গণমাধ্যম জামায়াতকে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার বা তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক জয়ন্ত সিনহা বলেন, ভারতের মিডিয়া যে ‘ফেয়ার’ নির্বাচনের কথা বলছে, তাদের সেই সংজ্ঞায় জামায়াতের কোনো জায়গা নেই। এটা এক ধরনের ‘সিলেক্টিভ জার্নালিজম।’

এমন সিলেক্টিভ জার্নালিজম বাংলাদেশেও লক্ষ্য করা গেছে। ভারতের ক্ষমতাসীনদের সুরেই তারা কথা বলে থাকেন। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে মোদি সরকার বাংলাদেশ থেকে নানা স্বার্থ আদায় করে নিয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই দেয়নি। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর ভারতের সেই কায়েমী স্বার্থে আঘাত লেগেছে। জামায়াতসহ বিভিন্ন দল এখন সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক চায় ভারতের সাথে। নতজানু নীতি প্রত্যাখ্যান করেছে তারা। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর স্পষ্ট ও দৃঢ় নীতির কথা জানে ভারত। তাই নির্বাচনের রাজনীতিতে জামায়াতের সাফল্য পছন্দ নয় ভারতের। ভারতীয় মিডিয়ায় সেই বার্তা বেশ স্পষ্ট। এটা করতে গিয়ে ওইসব গণমাধ্যম সম্পাদকীয় নীতিমালা লংঘন করে যাচ্ছে স্পষ্টভাবেই। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ দেশপ্রেমিক কোনো দলকে পছন্দ করে নিলে, ভারতীয় গণমাধ্যমের কিছু করার থাকবে কী?