সীমান্তে আবারও বাংলাদেশী হত্যার দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া সীমান্তে ২ জন এবং এবং ৩০ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্তে দু’জন, ২৯ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে ১ জনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এতে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, “লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে সুবজ নামের (২৫) এক বাংলাদেশী যুবককে গুলী করে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বৃহস্পতিবার ভোরে সীমান্তের ৮৬৪ ও ৮৬৫ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি জায়গায় তাকে গুলী করা হয়। একই দিনে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া সীমান্তের দশটেকি এলাকায় বিএসএফ-এর গুলীতে সুকিরাম (২৫) নামে এক বাংলাদেশী যুবক নিহত হয়েছেন। এদিকে গত ২৯ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর সীমান্তে শহিদুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশীকে হত্যার পরের দিন (৩০ নভেম্বর) গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আন্তর্জাতিক পিলার ৭৬ ও ৭৭ নম্বরের মধ্যবর্তী স্থানে ভারতের নিমতিতা বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা ইব্রাহিম রিংকু এবং মমিন মিয়া নামের ২ বাংলাদেশিকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার পর লাশ পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
গত এক দশকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গুলী ও নির্যাতনের ঘটনায় বাংলাদেশী হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জানা গেছে, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে ৭ দেশের। এর মধ্যে বিএসএফের গুলীতে সর্বোচ্চ হত্যার ঘটনা ঘটে বাংলাদেশ সীমান্তে। গত ১১ মাসে বিএসএফের গুলীতে ২৮ বাংলাদেশী নিহতের তথ্য দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। তাদের হিসাবে, গত ১১ বছরে নিহত হয়েছে ৩৪৫ জন। আওয়ামী লীগ আমলেও বছরে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, সীমান্তে বিএসএফের গুলীতে ২০১৪ সালে ৩২ জন, ২০১৫ সালে ৪৬ জন, ২০১৬ সালে ৩১ জন, ২০১৭ সালে ২ জন, ২০১৮ সালে ১৫ জন, ২০১৯ সালে ৪৩ জন, ২০২০ সালে ৪৯ জন, ২০২১ সালে ১৮ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন এবং ২০২৪ সালে ৩০ জন নিহত হয়েছে। অপর এক সূত্র বলছে, চলতি বছরের ১১ মাসে অন্তত ৩১ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। সাম্প্রতিক হত্যার নিন্দা জানিয়েছে ডাকসু ও ইসলামী ছাত্র শিবির। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত সীমান্তে হত্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। বুধবার ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ করা হয়। ৪ ডিসেম্বর এক যৌথ প্রতিবাদ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এবং সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানান এবং ঘটনার পূর্ণ তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয়দের এ ধরনের হত্যা ও নির্যাতন চরম অমানবিক এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের অন্যায্য সীমান্ত শাসনের উদাহরণ, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
আমরা মনে করি, একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের ধারাবাহিকভাবে বিনাবিচারে হত্যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধের শামিল। বাংলাদেশ সরকার, মানবাধিকার সংস্থা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বারবার সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদ ও হত্যা বন্ধের দাবি জানালেও ভারত সরকার কর্ণপাত করছে না। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ বৈঠক করলেও সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যত কোনো সফলতা দেখা যায়নি। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এ লাগাতার হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, শুধু মৌখিক আশ্বাস এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সময় এসেছে বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর ও মজবুত করার। আমরা সীমান্তে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা মনে করি এখন আর উদাসীন থাকার সুযোগ নেই। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতকে বার্তা দিতে হবে-বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবন কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার ভারতীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই।