নিকোলাস কোপারনিকাসের কথা আমরা জানি। তদানীন্তন পোল্যান্ড রাজ্যে ১৪৭৩ সালে তার জন্ম হয়েছিল। তিনি বড় হলেন, বিজ্ঞানী হলেন। তার সময়ে তিনি প্রচলিত ধারণার বাইরে একটি বিপ্লবী বক্তব্য রাখলেন। বললেন, মহাবিশ্বের (Universe) কেন্দ্রে পৃথিবী নয়, বরং রয়েছে সূর্য। সূর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী ঘুরছে। আসলে কেউই স্থির নয়, গ্রহ-নক্ষত্র সবই আপন আপন কক্ষপথে ঘুরছে। তবে কোপারনিকাসের আবিষ্কারের সাথে জড়িয়ে আছে একটি ‘কিন্তু’। তাকে এক ব্যক্তির ডাটা ও মেথম্যাথিকেল মেথডসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। সেই আরব স্কলারের নাম আলবিতানি (Albitani)। তার গবেষণা লিপিবদ্ধ হয়েছিল আরবি ভাষায়। পরে তা ল্যাটিনে অনূদিত হয়। এরপর আলবিতানির গবেষণার সাথে পরিচিত হয় ইউরোপ।
আমার আজকের ভাবনা কোপারনিকাস কিংবা নিরেট বিজ্ঞান নিয়ে নয়, বরং অন্য কিছু নিয়ে। মানুষও কি গ্রহ-নক্ষত্রের মত ঘুরছে? তার কক্ষপথের পরিচয় কী? পৃথিবীতেই কি মানুষের ঘোরাঘুরির শুরু এবং শেষ? নাকি তার স্থানান্তরের কোনো বিষয় আছে? পরকাল বিষয়টা আসলে কেমন? সেখানে কৃতকর্মের জবাবদিহিতার কোনো বিষয় আছে কী? বর্তমান সভ্যতায় যারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সে ইহুদি এবং খৃস্টানদের ধর্মগ্রন্থ তৌরাত এবং ইঞ্জিলে কী বলা হয়েছে? সেখানেও পরকালে জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ আছে। কুরআনে তো আছেই। ইসলামে মানুষের কক্ষপথের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে মানুষের কক্ষপথের সূচনা হয়েছে, সেটা আলমে আরওয়ভ বা রূহের জগতে। সে জগতে প্রতিটি রূহকে মহান আল্লাহ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আলাসতু বিরাব্বিকুম’-আমি কি তোমাদের রব নই? তখন সবরূহ বলেছিল, ‘বালা’- হ্যাঁ নিশ্চয়ই।
এরপর আমরা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করলাম-বেড়ে উঠলাম। পৃথিবীটা হলো ওই আদি অঙ্গীকার পূরণে এক পরীক্ষার জগৎ। আল্লাহ আমাদের রব, আমরা তার বান্দাহ। বান্দার মূল কাজ হলো- ঘরে-বাইরে, জীবনের সর্বক্ষেত্রে রবের বিধানের আনুগত্য করা। একসময় আমাদের পৃথিবীর জীবন শেষ হবে। তারপর আলমে বরযখ, কিয়ামত, বিচার, বেহেশত-দোজখ। পরকালে রয়েছে মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতার অনন্ত জীবন, সেই জীবনের তুলনায় মানুষের পৃথিবীর জীবনের পরিসর খুবই ক্ষুদ্র, মুহূর্তের জীবনও বলা যাবে না। এ হলো মানুষের জীবনচক্র তথা কক্ষপথের যৎকিঞ্চিত বর্ণনা। পৃথিবীর বড় বড় ধর্মগুলোর বর্ণনাও প্রায় একই রকম। হযরত আদম (আ:), মূসা (আ:), ঈসা (আ:), শেষ নবী মোহাম্মদ (স:)সহ সব নবী-রাসূলদের বর্ণনায় মানুষের কক্ষপথ বা জীবনচক্রের একই চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, সব নবী-রাসূলদের বর্ণনায় মানুষের কক্ষপথ সম্পর্কে বর্ণনা একই রকম হওয়ার পরও মানুষ বিভিন্ন কক্ষপথে বিভক্ত হয়ে পড়লো কেন? গ্রহ-নক্ষত্র তো নির্দিষ্ট আপন কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয় না, কারণ বিচ্যুত হলেই তো ধ্বংস। তাহলে স্রষ্টা বর্ণিত কক্ষপথ থেকে মানুষ বিচ্যুত হয় কোন কাণ্ডজ্ঞানে?
গ্রহ-নক্ষত্র ঘুরছে, মানুষও ঘুরছে। তবে মানুষের ঘোরার মধ্যে রয়েছে রকমফের। কেউ স্রষ্টাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, কেউবা ঘুরছে প্রবৃত্তিকে কেন্দ্র করে। যারা স্রষ্টাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে তাদের রয়েছে সুনির্দিষ্ট জীবনদর্শন, বিধি-বিধান এবং পথচলার পদ্ধতি। তাদের সামনে রয়েছে পদাঙ্ক বা উদাহরণ। নবী-রাসূলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চললে বিভ্রান্তির ক্ষতি থেকে বিশ্বাসীরা বেঁচে যেতে পারেন। এসব সুবিধা কিন্তু প্রবৃত্তিপূজারীদের নেই। সৃষ্টি, স্রষ্টা এবং জীনযাপন সম্পর্কে প্রথম নবী আদম (আ:)-এর জীবন দর্শনের সাথে মিল রয়েছে শেষ নবী মোহাম্মদ (সা:)-এর জীবন দর্শনের। এটা কী করে সম্ভব হলো? তাদের মধ্যে তো কোনো সভা-সেমিনার কিংবা মতবিনিময় হয়নি, তাহলে কেমন করে তারা একই সুরে কথা বললেন? যদি বলি, তাদের ‘সোর্স অব নলেজ’ বা জ্ঞানের সূত্র ছিল একটাই অর্থাৎ আসমানী জ্ঞান ও ওহীজ্ঞান। এমন বলায় কি কোনো ভুল আছে? ভুলের প্রশ্ন আসে না, বরং ওহী জ্ঞানের অকাট্য ও নির্ভুল উদাহরণ মানুষের পথচলাকে করতে পারে দ্বিধাহীন, দৃঢ় ও সুন্দর। যুগে যুগে বিশ্বাসীরা তেমন উদাহরণ রেখে গেছেন।
এবার প্রবৃত্তিপূজারীদের কথা বলতে হয়। তাদের নির্দিষ্ট একক কোনো দর্শন নেই। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাদের একেক পণ্ডিতের একের মত। এদের এক মতে, স্রষ্টা বলতে কেউ নেই। কোনো পণ্ডিত আবার স্রষ্টাকে শুধু ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। সমাজ, রাষ্ট্র, শিল্প-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে স্রষ্টার প্রবেশাধিকার দিতে চান না প্রবৃত্তিপূজারী অনেক পণ্ডিত। এসবের মাধ্যমে তারা আসলে প্রকৃত প্রভুকে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে নিজেরাই প্রভু হয়ে উঠতে চান। এসব ক্ষুদ্র প্রভুরা সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে শাসন করার জন্য নানা তত্ত্বও আবিষ্কার করেছেন। এখানে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। বর্তমান সভ্যতায় প্রবৃত্তিপূজারীদের তৎপরতা ব্যাপক রূপ লাভ করেছে। তারা বড় বড় ঘটনাও ঘটিয়েছেন। প্রসঙ্গত এখানে ইউরোপীয় রেনেসাঁ, শিল্পবিপ্লব, রুশবিপ্লব, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা উল্লেখ করা যায়। এখানে জলবায়ু সংকট ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কথাও উল্লেখ করতে হয়। এসব সংকট আমাদের প্রিয় পৃথিবীটাকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রবৃত্তি পূজারী ক্ষুদ্র প্রভুরা অবগত আছেন। এনিয়ে তারা সভা করেন, সম্মেলন করেন কিন্তু সংকট দূর হয় না। সংকট দূর করতে হলে তো কথা ও কাজে মিল থাকা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র প্রভুরা সম্মেলনে নানা প্রস্তাব গ্রহণ করলেও তা তেমন কার্যকর হয় না। জবাবদিহিতার চেতনা না থাকালে তো মানুষ দায়িত্ব পালনে সমর্থ হয় না। মহান প্রভুতো মানববান্ধন করে পৃথিবীটাকে সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু স্বার্থান্ধ ও অকৃতজ্ঞ ক্ষুদ্র প্রভুরা এখন সে ধরিত্রীকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। যে মানুষ মহান স্রষ্টাকে মান্য করে না, সেই মানুষ প্রকৃতির প্রতি, সমাজের প্রতি, বিশ্বের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে কেমন করে?
মানুষকে মানুষ হতে হলে মহান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হয়। এমন উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন ‘তাজকিয়াতুন নফস’ বা আত্মশুদ্ধি। শুদ্ধির এ কাজটি না হলে মানুষকে শাসন করবে ‘নফসে আম্মারা’ তথা মন্দ আত্মা। ক্ষুদ্র প্রভুরা এখন মন্দ আত্মার দাসে পরিণত হয়েছেন। এসব মানুষ এখন আর নৈতিক মানুষ নয়। এরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। বরং বিজয় ও ধ্বংসই এখন তাদের লক্ষ্য। এমন বিশ্বব্যবস্থায় এখন চলছে মারণাস্ত্র তৈরির প্রযোগিতা। পৃথিবীকে বহুবার ধ্বংস করার মতো পারমাণবিক অস্ত্র এখন পরাশক্তি মণ্ডলীর অস্ত্রাগারে মজুদ রয়েছে। কোনো শিশু যদি তাদের প্রশ্ন করে, তোমরা এসব দিয়ে কী করবে, খেলবে? খেললে তোমরা আনন্দ পাবে তো? আসলে এমন প্রশ্নের কোনো জবাব নেই প্রবৃত্তিপূজারী ক্ষুদ্র প্রভুদের। মানুষ বান্দা না হয়ে প্রভু হতে গেলেই বিপর্যয় ঘটে। তেমন এক বিপর্যয়ের মুখে বর্তমান সভ্যতা। গ্রহ-নক্ষত্র আপন আপন কক্ষপথে চলছে। কিন্তু মানুষ এখন বিভ্রান্ত, সে যেন আপন কক্ষপথ ভুলে গেছে। ফলে বিজ্ঞান প্রযুক্তির চর্চা এবং তার প্রোডাক্টিভিটি মানুষকে কাংখিত সমাজ ও জীবন উপহার দিতে সমর্থন হচ্ছে না বরং মারণাস্ত্রের অতি উৎপাদন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শংকাকে বাড়িয়ে তুলছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে। বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও। অনাকাংখিত এমন বাস্তবতা থেকে বাঁচতে হলে প্রবৃত্তিপূজারী ক্ষুদ্র প্রভুদের দম্ভ ত্যাগ করে মহান প্রভুর বান্দা হতে হবে। আপন কক্ষকে চিনতে হবে এবং চলতে হবে সেই কক্ষপথেই। তাহলে মহান স্রষ্টার সৌরজগতের মতো পৃথিবীতেও ফিরে আসবে শৃংখলা ও শান্তি। মানবের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চাও তখন পৃথিবীর জন্য হয়ে উঠবে অর্থবহ ও কল্যাণপ্রদ।