দেশে আবারও হাম-এর সংক্রমণ বাড়ার সাম্প্রতিক তথ্যকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, গত এক মাসে আক্রান্তের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল, নদীভাঙন কবলিত এলাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিগুলোতে এ প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। এ প্রবণতা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে- এটি হঠাৎ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের ঘাটতি, অবহেলা এবং অসমতার জমে ওঠা ফলাফল। প্রশ্ন হলো; হুট করে সংক্রমণ বাড়লো কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রথম ও প্রধান কারণ টিকাদান কাভারেজের ফাঁক। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু এখনো MR vaccine-এর পূর্ণ ডোজ পায়নি। অনেক ক্ষেত্রে জন্মের পর প্রাথমিক ডোজ নেওয়া হলেও দ্বিতীয় ডোজ বাদ পড়ে যায়। ফলে “আংশিক সুরক্ষিত” শিশুদের একটি বড় গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, কোভিড-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যসেবার স্বাভাবিক ছন্দে যে বিঘœ তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। অনেক এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, আবার কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি বা নজরদারির দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। এ গ্যাপগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী” তৈরি করেছে-যা এখন প্রাদুর্ভাব হিসেবে দৃশ্যমান।

তৃতীয়ত, ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈষম্য একটি বড় কারণ। শহরের বস্তি, চরাঞ্চল, দুর্গম উপকূলীয় এলাকাÑএসব জায়গায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এখনো চ্যালেঞ্জ। যেসব পরিবার নিয়মিত স্থানান্তরিত হয় বা অস্থায়ী বসতিতে থাকে, তাদের অনেক শিশু টিকাদান তালিকার বাইরে থেকে যায়। ফলে একটি “অদৃশ্য ঝুঁকি বলয়” তৈরি হয়, যা একসময় হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। চতুর্থত, অপুষ্টি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। পুষ্টিহীন শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই আক্রান্ত হয় এবং জটিলতায় পড়ে। তাই হামের প্রাদুর্ভাবকে কেবল সংক্রামক রোগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না; এটি একটি পুষ্টি ও দারিদ্র‍্য-সম্পর্কিত সমস্যাও।

হামের বহুবিধ ঝুঁকিও আছে যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অনেকেই হামকে “সাধারণ জ্বর” ভেবে ভুল করেন। বাস্তবে এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, শরীরে র‍্যাশ-এ উপসর্গগুলো শুরু হলেও তা দ্রুত জটিল রূপ নিতে পারে। চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এমনকি স্থায়ী অন্ধত্বের ঝুঁকি থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন হলো-এ উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, কাগজে-কলমে পরিকল্পনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে ঘাটতি থেকে যায়। অনেক সময় টিকা সরবরাহ, জনবল, প্রশিক্ষণ বা স্থানীয় সমন্বয়ের অভাবে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না। তাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো-টার্গেটভিত্তিক পরিকল্পনা, বাড়ি-বাড়ি অনুসন্ধান এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

এ সংকট মোকাবেলায় নাগরিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ব হলো শিশুর টিকা সম্পূর্ণ হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা। টিকার কার্ড যাচাই করা, নির্ধারিত সময়মতো ডোজ নেওয়া-এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মৌলিক দায়িত্ব। আক্রান্ত হলে শিশুকে আলাদা রাখা, পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার শিশুর রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গুজব থেকে দূরে থাকা। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া বা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

হামের এ প্রাদুর্ভাব আমাদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এটি দেখিয়ে দেয়, জনস্বাস্থ্য খাতে সামান্য শৈথিল্যও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগের পুনরুত্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই এখন প্রয়োজন তিনটি সমান্তরাল পদক্ষেপ-প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, পুষ্টি ও জনসচেতনতা বাড়ানো এবং তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহিতা ও মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। একটি শিশুর অসুস্থতা কখনোই শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। সেই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, এই প্রাদুর্ভাব ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।