শৈশবের রূপকথায় আমাদের পরিচয় ঘটেছিল দানবের সাথে। দানবের শাসন-প্রশাসন ও মর্জির মধ্যে ছিল এক আতঙ্কের পরিবেশ। শিশু মনে এর মন্দ প্রভাব পড়তো। মনস্তাত্তিক প্রভাব লক্ষ্য করা যেত শিশুদের রাতের ঘুমে। আতঙ্কে অনেকে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠতো। এর মূল ছিলো দানবের নৃশংসতা ও হত্যার ঘটনা। দিনে বড়রা ছোটদের বোঝাতে চেষ্টা করতেন, বলতেন-এতো রূপকথা, এতে ভয়ের কী আছে? এরপরও শিশুমনে দানবভীতি কাটতো না, দুষ্টজন হিসেবেই বিবেচিত হতো দানব। এখানে বলার মতো বিষয় হলো, সে দানব এখন আর রূপকথার গল্পে সীমাবদ্ধ নেই। বাস্তব দুনিয়ায় তার আবির্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বাস্তবের দানবকে আরো নৃশংস করে তুলেছে। এখনকার দানব শুধু ব্যক্তি মানুষকেই ভয় দেখায় না, ভয় দেখায় বিশেষ বিশেষ জাতিকে, জনপদকে। পুরো জাতিকে হত্যা ও ধ্বংস করতে এ দানব কুন্ঠিত নয়। এ দানবের নাম নেতানিয়াহু। কোনো কোনো দানবীয় রাষ্ট্রের সমর্থনে সে চালিয়ে যাচ্ছে তার নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ।

দানব তখনো ঘৃণার পাত্র ছিল, এখনো। ভয়ে মানুষ কিছুটা সময় চুপ থাকলেও, দানবকে কখনো গ্রহণ করে না, সম্মান করে না। বরং দানবের বিরুদ্ধে ঘৃণার প্রকাশ ঘটে নানাভাবে, নানা কৌশলে। এবার তার প্রকাশ ঘটেছে ‘ইউরো ভিশনের আসরে’। ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গীত প্রতিযোগিতা ইউরোভিশনের ২০২৬ সালের আসর বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্লোভেনিয়া ও স্পেন। বৃহস্পতিবার আয়োজক ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়নের (ইবিইউ) পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতায় ইসরাইলকে অংশগ্রহণে সুযোগের বার্তার পর এ চার দেশ আসর বয়কটের ঘোষণা দেয়। এর আগে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় গণহত্যার দায়ে ইসরাইলকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি ওঠে। এ বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভোটাভুটির জন্য আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার ইবিইউ-এর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ভোটাভুটির কোনো আয়োজন করা হবে না। উপলব্ধি করা যায়, ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়নের (ইবিইউ) কর্মকর্তাদের অনেকেই হয়তো দানবের ভয়ে বিবেক বিসর্জন দিয়েছেন। তবে এর বিপরীতে কিছু দেশ বিবেকের পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। আর তাদের বক্তব্যও শ্রদ্ধা করার মতো।

ইসরাইলকে অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় ব্রডকাস্টার আরটিই জানায়, গাজায় ভয়ঙ্কর জীবনহানি ও মানবিক সংকটের সাথে যুক্ত থাকার পরও ইসরাইলকে প্রতিযোগিতায় যুক্ত করায় ইউরোভিশনের আসন্ন আসর বয়কট করবে আয়ারল্যান্ড। এদিকে নেদারল্যান্ডসের ব্রডকাস্টার আভ্রোট্রসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘পুরো প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আভ্রোট্রস সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সাধারণ মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে আসরে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়, যা আমাদের সংস্থার মৌলিক বিষয়।’ স্লোভেনিয়ার রাষ্ট্রীয় ব্রডকাস্টার আরটিভি জানিয়েছে, তারাও ২০২৬ সালের ইউরোভিশনের আসরে অংশ নিচ্ছে না। সংস্থাটির প্রধান নাতালিয়া গ্রসকাক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের বার্তা হচ্ছে যদি ইসরাইল থাকে, তবে গাজায় মারা যাওয়া ২০ হাজার শিশুর পক্ষ থেকে আমরা অংশ নেব না।’ এছাড়া স্পেনের ব্রডকাস্টার সংস্থার সেক্রেটারি আলফানসো মোরালেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারাও ইউরোভিশনের আগামী আসর ভয়কট করছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোগ থাকলেও গাজার পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতাকে ইসরাইলের রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় ইউরোভিশনকে নিরপক্ষে সাংস্কৃতিক আয়োজক হিসেবে ধরে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে সবদেশ ইসরাইলকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানায়নি। যেমন জার্মানি। জার্মানি তো ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। উপলব্ধি করা যায়, পৃথিবী এখন দু’শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক শিবির দানবের পক্ষে, আর একশিবির মানবের পক্ষে। ন্যায় ও অন্যায়ের এই দ্বন্দ্ব চিরন্তন। ন্যায়ের পক্ষে থাকাই মানুষের কর্তব্য।