যা ইচ্ছে তা বলার এবং করার স্বাধীনতা পেয়ে গেছে বোধহয় ভারতের কিছু রাজনীতিবিদ। এ প্রজাতির রাজনীতিবিদরা অবশ্যই বিজেপি ঘরানার লোক। এরা আবার মোদিজির আশীর্বাদপুষ্ট এবং উগ্রবয়ানে দূষিতও বটে। ৩১ জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘দ্যা হিন্দু এবং এএনআই পরিবেশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়- ভারতের আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, এ রাজ্যে যখন ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)’ প্রক্রিয়া চলবে, তখন ৪ থেকে ৫ লাখ ‘মিঞা’ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হবে। গত মঙ্গলবার তার এমন বক্তব্যে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তিনসুকিয়া জেলার ডিগবয়তে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে হিমন্ত আরও বলেন, ‘মিঞা’ সম্প্রদায়কে কষ্টে রাখাই তার কাজ। উল্লেখ্য, আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের বোঝাতে ‘মিঞা’ শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং তাদের প্রায়ই ‘বাংলাদেশী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
ভাবতে অবাক লাগে, একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কী করে এতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন হন? প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের জানান দিয়ে হিমন্ত বলছেন, লাখ লাখ মুসলমানকে তিনি ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেবেন এবং তাদের কষ্টে রাখাই তার কাজ। এভাবে কথা বলে তিনি কি বোঝাতে চাইছেন? ভারত কি তা হলে শুধু উগ্রহিন্দুদের আবাসভূমিতে পরিণত হবে? এরপর তারা কোনমুখে বলবেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। ক্ষমতাসীন বিজেপি দলীয় এই মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ভোট চুরি মানে হলো, আমরা কিছু ‘মিঞা ভোট’ চুরি করার চেষ্টা করছি। আদর্শগতভাবে তাদের আসামে নয়, বাংলাদেশে ভোট দিতে দেওয়া উচিত।’ ভোটার তালিকার চলমান ‘বিশেষ সংশোধন (এসআর) প্রক্রিয়ার ‘দাবি ও আপত্তি’ পর্যায়ে হাজার হাজার বাংলাভাষী মুসলমানকে নোটিশ দেওয়া বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করছি, যেন তারা আসামে ভোট দিতে না পারেন।’ উল্লেখ্য, ভারতের নির্বাচন কমিশন দেশটির ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ পরিচালনা করছে।
তবে এ ক্ষেত্রে আসামে সাধারণ হালনাগাদের মতো বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। হিমন্ত বলেন, ‘কংগ্রেস আমাকে যত খুশি গালি দিক, আমার কাজ হলো মিঞা মানুষকে কষ্টে রাখা’। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার আইনের কাঠামোর মধ্যেই এ সম্প্রদায়ের জন্য কিছু ‘উৎপাত’ (বিঘ্ন) সৃষ্টি করবে। বিরোধীরা তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কী ভাবছেন, সেটি পাত্তা না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই সংশোধন (এসআর) প্রাথমিক মাত্র। যখন আসামে এসআইআর শুরু হবে, তখন ৪ থেকে ৫ লাখ মিঞা ভোট বাদ দিতে হবে।’
হিমন্তের কথাবার্তায় সভ্যতা-ভব্যতার কোন লেশ নেই। আর এখানে রাজনীতি কোথায়? রাজার আভিজাত্য নেই, নেই নীতির পরিশোধনও; যা আছে তা হলো সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতা। এদের থামাবে কে, মাথায় যে বসে আছেন স্বয়ং মোদিজি! আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য তো কোনো মানদণ্ডে টেকে না। এদিকে গত রোববার কংগ্রেস, রাইজর দল, আসাম জাতীয় পরিষদ, সিপিআই এবং সিপিআই (এম)সহ ছয়টি বিরোধী দল রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেয়। সেখানে তারা অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ব্যাপক লংঘন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রকৃত ভোটারদের হয়রানি করা হচ্ছে; যা স্বেচ্ছাচারী, বেআইনি ও অসাংবিধানিক। উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত এর আগেও বাংলাদেশ ও মুসলমানদের নিয়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চেয়েছেন। উগ্রবাদীরা তাদের কাজ করবে আমরা করবো আমাদের কাজ। আমরা ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ পতাকাকে উড্ডীন রাখবো এবং সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাবো শান্তির মোহনায়। আমাদের অসাম্প্রদায়িক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদের জন্য উদাহরণ হতে পারে। যারা শিখবে তারা উপকৃত হবে, অবশ্য শেখার জন্য তো সঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গী থাকা প্রয়োজন।