ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ খেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। এ মাসের শেষ নাগাদ পর্যন্ত ঋণ খেলাপিরা তাদরে মোট খেলাপি ঋণের মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আকারে ব্যাংকে জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ হিসাব ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে নিয়মিত করে নিতে পারবেন। এর মধ্যে ২ বছর গ্রেস পিরিয়ড দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এ দু’বছর পুনঃতফসিলিকরণকৃত ঋণ হিসেব থেকে কোন কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। বিগত সরকার আমলে আ হ ম মোস্তাফা কামাল অর্থমন্ত্রী থাকাকালে একবার ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তখন গ্রেস পিরিয়ড দেয়া হয়েছিল এক বছর। তখন এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কারণ সাধারণভাবে ঋণ কোন ঋণ হিসাব একবারে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য পুনঃতফসিলিকরণ করা যায়। একটি ঋণ হিসাব সর্বোচ্চ তিনবার পুনঃতফসিলিকরণ করা যেতো। প্রথমবার ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের জন্য মোট পাওনা খেলাপি ঋণের ১০ শতাংশ, দ্বিতীয় বার ২০ শতাংশ এবং তৃতীয় বারের জন্য ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হতো।

ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ ব্যাংকিং সেক্টরে নতুন কোন ঘটনা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সিস্টের চালু আছে। বাংলাদেশে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ ব্যাপকভাবে শুরু হয় ১৯৯১ সালে। সে সময় নির্বাচনে জয় লাভ করে বিএনপি ক্ষমতায় আসীন হয়। তারা ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) এর পরামর্শে একই বছর ২০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহৎ ঋণ খেলাপিদের একটি তালিকা পত্রিকায় প্রকাশ করে। এতে ১৭১ জন বৃহৎ ঋণ খেলাপির নাম স্থান পেয়েছিল। এদের প্রত্যেকের নিকট ব্যাংকের পাওনা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল আড়াই কোটি টাকা ও তদূর্ধ্ব। পরবর্তীতে এ ধরনের আরো তালিকা প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ঋণ খেলাপিরা সরকারের ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের ব্যবস্থা করে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু গত সরকার আমলে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেয়া হলে তা নিয়ে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মাাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

বিগত সরকার আমলে কিস্তি আদায় না করেই কৃত্রিমভাবে আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান প্রশাসনও ঠিক একই কাজ করছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর বাইরেও অনেক খেলাপি ঋণ রয়ে গেছে। ঋণ হিসাব পুনর্গঠন, ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ, ঋণ হিসাব অবলোপন ও মামলাধীন প্রকল্পের নিকট পাওনা অর্থ যোগ করা হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ থেকে ৯ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে অনেকেই মনে করেন। একজন সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে হলে তাকে অবশ্যই ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়া চলবে না। বর্তমানে রাজনীতি করছেন অথচ ব্যাংকের নিকট ঋণ খেলাপি এমন অনেকেই আছেন। তারা নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে পারবেন না। কিন্তু ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালার কারণে ঋণ খেলাপি রাজনীতিবিদগণ খুব সহজেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

তারা তাদের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করিয়ে নিলে আগামী ১০ বছর আর তাদের ঋণ খেলাপি হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না। আগামী ২ বছরের জন্য তাদের কোন কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। সত্যি দুর্ভাগ্য সেসব ঋণ গ্রহীতার যারা নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিয়মিত ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে চলেছেন। বারবার ঋণ খেলাপিদের অনৈতিক সুবিধা দেয়ার কারণে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারীদের হতাশা নেমে আসতে বাধ্য। ঋণ খেলাপিদের যদি অনৈতিক সুবিধা প্রদান অব্যাহত রাখা হয় তাহলে যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন তাদের ক্ষেত্রে সুদের হার কমিয়ে দেয়া যেতে পারে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের এই নতুন উদ্যোগ কোনভাবেই সমর্থনীয় নয়।