হেফাজতে ইসলামের একটি বিবৃতি আমাদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। বুধবার বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আচরিত ধর্মীয় ঐতিহ্য ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে পহেলা বৈশাখের মতো জাতীয় উৎসবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ওপর চাপানো যাবে না। এমন কিছু করার চেষ্টা হলে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতাকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে প্রতিহত করা হবে। বিবৃতির বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। এখানে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে জড়িত একটি বিষয়। সম্প্রদায় বিশেষের এমন একটি বিষয়কে পহেলা বৈশাখের মতো একটি জাতীয় উৎসবের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বিবেচনার বিষয় হলো, কোন চেতনা থেকে এমন বিবৃতি প্রদান করা হলো ? এখানে কি কোনো সাম্প্রদায়িক চেতনা কাজ করেছে, নাকি ভিন্ন সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনমূলক চাতুর্যের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে। কোনো বিষয়ের সাথে যখন ‘মঙ্গল’ শব্দ যুক্ত করা হয়, তখন সেখানে আসলে বিশেষ বিশ্বাস তথা জীবনদর্শনকে যুক্ত করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রার যে রূপ আমরা দেখেছি, সেখানে একটি চিত্র আছে। ময়ূর, পেঁচাসহ বিভিন্ন পশু-পাখির মুখোশ পরে যে শোভাযাত্রা, তার বার্তা কী? বিশেষ ধর্মের মানুষ এই শোভাযাত্রায় ‘মঙ্গল’ খুঁজে পেতে পারেন তাদের বিশেষ বিশ্বাসের কারণে। কিন্তু দেশের সিংহভাগ মুসলিম জনতা এখানে কোনো মঙ্গল খুঁজে পান না, বরং বিশেষ ঘরানার মিছিলের সাথে ‘মঙ্গল’ যুক্ত করায় তা তাদের বিবেচনায় একটি গর্হিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ তাদের পছন্দের বিষয় নয়। আর সমাজবিজ্ঞান তাদের আর একটি বার্তা দেয়, সেটি হলো ‘টোটেম বিশ্বাসের’ বার্তা। অজ্ঞতার যুগে পিছিয়ে পড়া মানুষ বিশ্বাস করতো, বিশেষ বিশেষ পশু-পাখি তাদের মঙ্গল-অমঙ্গল সাধনে সক্ষম। তাই তারা ওইসব পশু-পাখিদের সম্মান করতো, পূজা করতো। তাদের মুখোশ ধারণ করাও তাদের কাছে ছিল পুণ্যের কাজ। মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রবক্তারা কি পিছিয়ে পড়া ওইসব মানুষদের টোটেম বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি আস্থা রাখেন? কিন্তু দেশের মানুষ তো এগিয়ে যেতে চায়, প্রগতির সড়কে হাঁটতে চায়। পিছিয়ে পড়ে থাকার মধ্যে তো কোনো মঙ্গল নেই। এই বিষয়টিও মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রবক্তারা ভেবে দেখতে পারেন।
হেফাজতের বিবৃতিতে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সংস্কৃতি মন্ত্রীর বক্তব্যে আসন্ন পহেলা বৈশাখে সর্বজনগ্রাহ্য ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র পরিবর্তে পরিত্যক্ত সাম্প্রদায়িক ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আয়োজনের কৌশলী প্রচেষ্টা ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপস্থাপিত তার বক্তব্য সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় উসকানিমূলক বলে আমরা মনে করি। এছাড়া ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ও ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র মধ্যে পার্থক্য নেই বলে তার দাবিটিও অজ্ঞতাপ্রসূত ও বিভ্রান্তিকর। বিবৃতিতে বলা হয়, শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আচরিত ধর্মীয় ঐতিহ্য ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে পহেলা বৈশাখের মতো জাতীয় উৎসবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমনাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করলে ওলামায়ে কেরাম চুপ করে বসে থাকবেন না। বিবৃতিতে একটি তথ্যযুক্ত করে বলা হয়, ১৯৮৯ সালে ঢাবি চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সর্বপ্রথম আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। তখন এর নাম ছিল ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। কিন্তু ১৯৯৬ সালে ভারতের পুতুল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার বছরে এদেশের হিন্দুত্ববাদী কালচারাল সেক্যুলার ফ্যাসিস্টরা পহেলা বৈশাখ উদযাপনে পূর্বের ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নাম পাল্টে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ রেখে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ভুয়া দাবি প্রতিষ্ঠিত করে। হেফাজতে ইসলামের বিবৃতিতে যেসব বিষয় উঠে এসেছে তা বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে যুিক্ত আছে, তথ্য আছে এবং একটি জাতীয় উৎসবকে যেভাবে দেখা উচিত তেমন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আছে। আশা করি সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বিষয়টি উপলব্ধি করবেন এবং আনন্দ শোভাযাত্রার পক্ষেই মত দেবেন। তবে এর বিপরীতে গিয়ে তিনি যদি সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের চাতুর্যকে গ্রহণ করেন, তাহলে মন্ত্রীর যে পদমর্যাদা তার অবমাননা হবে। এতে দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হবে, যা দেশের জন্য এবং দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশের জন্যও কল্যাণকর বলে প্রতীয়মান হবে না। আশা করি, মন্ত্রী মহোদয় সুবিবেচনার পরিচয় দেবেন।