মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, মানুষ এখন কতটা মানুষ? অথচ এ মানুষই এখন সমাজ নিয়ে, সভ্যতা নিয়ে অহংকার করে। বড় মানুষ এবং বড় রাষ্ট্রের আচরণে অহংকারের মাত্রা বেশি লক্ষ্য করা যায়। প্রসঙ্গত আমাদের প্রতিবেশী বড় রাষ্ট্র ভারতের কথা উল্লেখ করা যায়। আয়তনের দিক থেকে ভারত অবশ্যই একটি বড় রাষ্ট্র। দেশটির সংবিধানেও অনেক সুন্দর সুন্দর কথা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে, ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ দর্শনের কথা। বহু ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার দেশটিতে ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, দেশটি যেন ক্রমেই এ দর্শন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছে। মোদি সরকারের আমলে এর মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মবিদ্বেষ এর বড় প্রমাণ। ভারতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ইসলাম বিদ্বেষ। পরিস্থিতি দিন দিনই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী কেউই বাদ যাচ্ছেন না। এবার কলেজ ক্যাম্পাসে নামাজ পড়ায় তিন মুসলিম ছাত্রকে চরম অপমান ও লাঞ্ছিত করেছে হিন্দু চরমপন্থীরা। ঘটনাটি ঘটেছে মহারাষ্ট্রের কল্যাণ নামক এলাকায়। মুসলিম শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণের পরও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে ওই এলাকায়। মঙ্গলবার কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস এবং আমেরিকাভিত্তিক মুসলিম নেটওয়ার্ক টিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে নামাজ পড়া নিয়ে। ক্লারিয়ন ইন্ডিয়া নামের একটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, সম্প্রতি মুম্বাইয়ের কাছে কল্যাণের আইডিয়াল কলেজ ক্যাম্পাসের একটি নির্জন শ্রেণীকক্ষে তিনজন মুসলিম শিক্ষার্থী নামাজ আদায় করছিলেন, যার ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয় হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দলের সদস্যরা। হিন্দু চরমপন্থীরা ‘হিন্দু অনুভূতিতে আঘাত’ করার অভিযোগ এনে মুসলিম ছাত্রদের শাস্তি দাবি করে। এসময় তারা ওই ছাত্রদের ক্ষমা চাইতে এবং ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের মূর্তির সামনে মাথা নত করে প্রণাম করতে বাধ্য করে। ঘটনার পুরোটা সময় সেখানে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুলিশ সদস্যরা।

এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে পুরো বিষয়টি নিয়ে মুসলিম ছাত্রদের চরম অপমান ও লাঞ্ছিত করা হয়। ওই সময় তিন ছাত্রকে ঘিরে চরমপন্থীরা ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে থাকে, এসময় হুমকিও দেওয়া হয়। স্লোগানটি হলো, ভারতজুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক একটি স্লোগান। স্থানীয় মুসলমানরা অভিযোগ করেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। মূর্তির পা স্পর্শ করতে বাধ্য করা হয়েছিল মুসলিম ছাত্রদের। মূলত বিজেপিশাসিত বেশ কয়েকটি অঞ্চলে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় এমন পরিস্থিতি প্রকট হয়ে উঠছে। এসব অঞ্চলে হিন্দু চরমপন্থীরা কোনো কারণ ছাড়াই মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। পুলিশ সংখ্যালঘু মুসলমানদের রক্ষা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। এর আগে পুনেতেও নামাজ পড়ার কারণে মুসলিম নারীদের লাঞ্ছিত করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু মুসলিমদের কি ধর্মীয় অধিকার থাকতে নেই? থাকলে নামাজের মত পবিত্র একটি ইবাদতের বিরুদ্ধে এমন উগ্র আচরণ কেন? আর পুলিশ প্রশাসন দুষ্টের দমনের বদলে পালনের উদাহরণ সৃষ্টি করে কী বার্তা দিতে চাচ্ছে? এমন আচরণ কি ভারতের জন্য আদৌ কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে?