ইহুদিরাষ্ট্র ইসরাইলের তো অনেক শক্তি, অনেক ক্ষমতা; তারপরও দেশটি থেকে ইহুদিরা ইউরোপে সরে যাচ্ছেন কেন? এই প্রশ্নের মধ্যে অনেক কিছুই সুপ্ত আছে, কিছু প্রকাশ পাচ্ছে-কিছু হয়তো প্রকাশিত হবে ভবিষ্যতে। প্রসঙ্গত এখানে ইসরাইলি নাগরিক আব্রাহাম বিনেন ফেল্ডের কথা উল্লেখ করা যায়। ২০২৩ সালে দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের অভিযানের পর নিরাপত্তা নিয়ে বেশ শংকিত হয়ে পড়নে আব্রাহাম। গাজা নিয়ে ইসরাইল সরকারের পরিকল্পনা নিজ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বাধ্য করে তাকে। পরে সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ফোর্সে যোগ দিয়ে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেন আব্রাহাম। কারণ, তার দু’ভাই যুদ্ধ ইউনিটে থাকায় ভাইদের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। তবে দেশ ছাড়ার বিষয়টি তার মাথায় ছিল বেশ ভালোভাবেই। এখনকার পরিস্থিতি হলো, ইসরাইল ও হামাস যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। এমন চিত্র আব্রাহমকে দেশত্যাগে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি। উল্লেখ্য, গাজা যুদ্ধের পর থেকে গত দু’বছরের কয়েক হাজার ইসরাইলি স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। ইসরাইলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান বুরোর মতে, ২০২৪ সালে এক কোটি নাগরিকের মধ্যে ৮০ হাজারেরও বেশি নাগরিক দেশ ছেড়েছেন এবং এ বছরও একই সংখ্যা ধারণা করা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন জেগেছে, বিজয়ের পরও কেন এই দেশত্যাগ?

এদিকে ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি চারজনের মধ্যে একজনেরও বেশি ইসরাইলি দেশত্যাগের কথা ভাবছেন। গত রোববার প্রকাশিত এ নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ২৭ শতাংশ ইসরাইলি দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। যদিও তাদের বেশিরভাগই বিশ্বাস করেন, গণহারে দেশত্যাগ রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হবে। এপ্রিল মাসে ৭২০ জন ইহুদি এবং ১৮৭ জন আরব নাগরিকের মধ্যে এ জরিপ চালানো হয়। সেখানে ৩০ শতাংশ আরব এবং ২৬ শতাংশ ইহুদি দেশত্যাগের কথা ভাবছেন। তাদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদিরা ধর্মীয় বিষয়ের চাইতে নিরাপত্তা, রাজনীতি, কর্মসংস্থান এবং জীবন যাত্রার ব্যয় নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। তাই তারা দেশ ছাড়তে আগ্রহী। ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি তরুণদের ৬০ শতাংশ বিদেশে যেতে চাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ইহুদিদের ইসরাইল থেকে চলে যাওয়ার বিষয়টি বিশ্বের সচেতন মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অথচ এক সময় বিশ্বের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইহুদিরা বেশ উদ্দীপনার সাথে এসে বসতি নির্মাণ করেছিলো ইসরাইলে। তবে তাদের কুকর্মের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ইহুদিরা ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনিদের শুধু উৎখাত করেনি, নৃশংসভাবে হত্যা করেছে ফিলিস্তিনি নারী, শিশু ও পুরুষদের। এভাবে তারা তাদের বসতির বিস্তার ঘটিয়েছে ফিলিস্তিনে। তাদের আগ্রাসনের নিকৃষ্ট উদাহরণ গাজা। গাজাকে তারা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। এ কারণে একটি যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে ইসরাইল, যার নায়ক প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এতকিছুর পরও এখন ইসরাইল থেকে সরে পড়ছে ইহুদি নাগরিকরা। বিষয়টি ভেবে দেখার মতো। ইসরাইলি নাগরিক আব্রাহাম বিনেন ফেল্ড গাজা নিয়ে ইসরাইল সরকারের পরিকল্পনায় স্বস্তি পাচ্ছেন না। হামাসের অভিযান নিয়েও তিনি শংকিত। আর যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত হামলার কারণে দেশত্যাগের পরিকল্পনা নিতে বাধ্য হয়েছেন আব্রাহাম। আরও অনেকেই অনুসরণ করছেন তার পথ। যদিও তারা জানেন, এভাবে গণহারে দেশত্যাগ ভবিষ্যতে ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। আসলে রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের মত আচরণ করতে হয়। নিজে শান্তিতে থাকতে হলে, অপরকেও শান্তিতে থাকতে দিতে হয়। নেতানিয়াহু সরকার এ নীতি লংঘন করেছে ভয়ংকরভাবে। ফলে পুরো এলাকাতেই অশান্তির আগুন জ¦লছে। এ আগুনে কখন কে পুড়ে মরবে, কে জানে? তাইতো লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইহুদিদের ইসরাইল ত্যাগের হিড়িক।