আধুনিক বিশ্বে পর্যটন শিল্প হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ শিল্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম মাধ্যম। আমাদের দেশেও পর্যটন শিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরকারের যথাযথ উদ্যোগের অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমাদের পর্যটন যথাযথভাবে বিকাশ লাভ করেনি।

একথা কারো অজনা নয় যে, আমাদের দেশে পরিচিত-অপরিচিত অনেক পর্যটন স্পট রয়েছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক মসজিদ এবং মিনার, পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, অরণ্য, বিস্তীর্ণ হাওড়, চা বাগান অন্যতম। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকা বিভিন্ন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হচ্ছে বাংলাদেশের কক্সবাজার। রয়েছে একমাত্র পাহাড়ঘেরা দ্বীপ মহেশখালিসহ আরও অনেক আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, সুন্দরের রহস্যেঘেরা বাংলাদেশের পর্যটন খাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবার চেয়ে পিছিয়ে। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন এর অন্যতম কারণ। একথা কারো অজানা নয় যে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নানা সংকট, আর প্রচারণার অভাবে বিদেশি পর্যটক টানতে না পারায় আশঙ্কাজনকভাবে কমছে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ খাতকে এগিয়ে নিতে পর্যটনবান্ধব নীতিমালা তৈরির তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। অন্যদিকে তলানিতে থাকা পর্যটন শিল্পকে টেকসই করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি পর্যটন করপোরেশনের। কিন্তু এক্ষেত্রে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই। ফলে আমাদের পর্যটন শিল্প আজও অবহেলিত ও উপেক্ষিতই রয়েছে গেছে। অপার সম্ভাবনাকে আমরা কোনভাবেই কাজে লাগাতে পারছি না।

মধুমতি, ধানসিঁড়ি বিধৌত বাংলাদেশের সৌন্দর্য আমাদের অহংকার। মেঘ-রোদ্দুরের সুখ, অবারিত সবুজের প্রান্তর জুড়ে সৌন্দর্যের লীলাভূমি। তাই ভ্রমণ পিপাসু মানুষ মনের অজান্তেই বারবার ফিরে আসে রূপসী বাংলার সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হওয়ার জন্য। নির্মল আনন্দ উপভোগ ও মানসিক প্রশান্তি লাভের জন্যই রহস্যের মাঝেই আবৃত দেশের পর্যটন খাত। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবেই তা খুব একটা সামনের দিকে এগোতে পারেনি। ফলে আমাদের পর্যটন শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি।

সময়ের সঙ্গে দেশের পর্যটন খাত বিস্তৃত হয়েছে ঠিকই, তবুও ভ্রমণের হিসাবে রয়েছে অপ্রাপ্তিও। নিকট অতীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দেশের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, ভিসা জটিলতাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়েছে দেশের অতি সম্ভাবনাময় এ খাত। রয়েছে জনবল সংকটও। এমন বাস্তবতায় কমেছে বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্য মতে, দেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদানমাত্র তিন শতাংশের কিছু বেশি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্যানুযায়ী, গেল এক বছরে বিদেশি পর্যটকদের থেকে আয় কমেছে এক কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ১৫৯ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩ সালে বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে বাংলাদেশ আয় করেছিল ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ডলারে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে প্রচারণার অভাব, মাঠ পর্যায়ে দক্ষ ট্যুরিস্ট গাইড না থাকায় একদিকে যেমন ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা, তেমনি রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সেবা সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘আমাদের যে গেস্ট হাউজ সেখানে প্রতি সপ্তাহে আমরা ১০ থেকে ১২ জন বিদেশি পর্যটক পেতাম। গত এক মাসের ভেতরে আমরা একজন বিদেশি পর্যটকও পাইনি।’ সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, টেকসই মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে পিছিয়ে রয়েছে দেশের পর্যটন খাত। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ খাতে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নের তাগিদ দিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘হাওড় অঞ্চল, সাজেক বা নিঝুম দ্বীপ-সে জায়গাগুলোর স্থানীয় মানুষের অর্থনীতিকে যদি মুক্তি দিতে হয় তাহলে একমাত্র ইন্ডাস্ট্রি হলো পর্যটন শিল্প।’

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সূত্র বলছে, সম্মিলিত উদ্যোগের অভাবে বিকাশ ঘটছে না পর্যটনে। সংকট থেকে উত্তরণে পর্যটনবান্ধব নীতিমালা তৈরিসহ সরকারি সহায়তার দাবি তোলা হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে। টোয়াব সভাপতির মতে, ‘পরিকল্পনা মাফিক যদি আমরা পর্যটন স্পটগুলো, পর্যটন প্রোডাক্টগুলো যদি আমরা দৃষ্টিপাত দেই তাহলে ট্যুরিজম সাস্টেইন করবে। এটা শুধু সরকার বা শুধু প্রাইভেট স্টেক হোল্ডার বা কোনো ট্যুর অপারেটর বা অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের একার পক্ষে সম্ভব না, আমার দেশের জনগণ যদি সচেতন না হয়।’

ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স-২০২৪’র পরিসংখ্যান বলছে, এ খাতে ১১৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার তলানিতে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের বক্তব্য হলো, ‘আমাদের টার্গেট অন্ততপক্ষে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা। ১০ শতাংশ না পারলেও অন্ততপক্ষে ছয় বা সাত শতাংশ হলে আমাদের ট্যুরিজমের সাইজ বড় হবে। এটা প্রোপার প্ল্যানিং, মার্কেটিং-এর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’

বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও নানা সংকটে অনেকটা পিছিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন খাত। এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটনে গতি আনতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। কিন্তু এ বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই। যা আছে তা শুধু কথামালার ফুলঝুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে নিতে স্বপ্ল, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপ। বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য দেশের পর্যটন স্পটগুলোকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে হবে। বাড়াতে হবে অবকাঠামোগত সুবিধাও। তাহলেই আমাদের পর্যটন শিল্প সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।