আপন শক্তিতেই মানুষকে বলীয়ান হতে হয়, দেশের ক্ষেত্রেও কথাটি প্রযোজ্য। প্রসঙ্গত এখানে জ¦ালানির কথা উল্লেখ করা যায়। বর্তমান সভ্যতায় জ¦ালানি একটি নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। জ¦ালানি ছাড়া আমরা অচল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জ¦ালানি সম্পদে কয়টি দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে অভাব রয়েছে, রয়েছে সংকটও। ফলে জ¦ালানি এখন শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, রাজনীতির বিষয়ও বটে। বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও কল-কারখানার সভ্যতায় জ¦ালানি তথা জীবাশ্ম জ¦ালানির অতিব্যবহার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে সংকট সৃষ্টি করেছে। এমন অবস্থায় নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদ সূর্যের আলোকে কাজে লাগাবার কথা বলা হচ্ছে। ভারসাম্যহীন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায়ও মানুষকে, দেশকে বেঁচে থাকার, টিকে থাকার যুদ্ধটা করে যেতে হবে। এ ব্যাপারে যারা গাফেল থাকবে তারা শুধু পিছিয়ে পড়বে না, দুর্ভোগও পোহাতে হবে। বিষয়টি বোধহয় আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া উপলব্ধি করতে পেরেছে।
সিএনএন জানায়, আফ্রিকায় ইলেকট্রিক যানবাহনের (ইভি) বাজার দ্রুতগতিতে সম্পসারি হচ্ছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাজার ৪২০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এটি বর্তমান বাজারের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। তবে এখানে বেশিরভাগ ইভি বিদ্যুৎনির্ভর। অবশ্য কিছু কিছু ইভি নবায়নযোগ্য ও জীবাশ্ম জ¦ালানি ব্যবহার করছে। এরই মধ্যে তিউনিসিয়ার গাড়ি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ‘বাকো মোটরস’ ইভি গাড়ির বাজার ধরতে চাচ্ছে। এজন্য তারা আফ্রিকার অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ সূর্যের আলোকে কাজে লাগাচ্ছে। তাদের উৎপাদিত গাড়ি ও কার্গোভ্যানের ছাদে সোলার প্যানেল (সৌরশক্তি প্যানেল) বসানো হয়েছে।
বিষয়টি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বলা হচ্ছে, সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে তিউনিসিয়ায় গাড়িশিল্পে বিপ্লব ঘটানো হয়েছে। এসব যানবাহনে এখনো লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও বাড়িতে কিংবা ভ্রমণের সময়ও গাড়িতে চার্জ দেওয়া যায়। আর এটি করা হয়, সোলার প্যানেলের মাধ্যমে। এই প্যানেল ব্যবহার করে সরাসরি ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যায়, যা বিনামূল্যে ব্যবহার করা জ¦ালানির একটি উৎস। এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি এ ধরনের ১০০ যানবাহন তৈরি করেছে। আগামী বছর উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বাকো মোটরসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বুবাকার সিয়ালা বলেছেন, ‘সৌরশক্তি আমাদের ৫০ শতাংশের বেশি চাহিদা পূরণ করছে।’ সিয়ালা উদাহরণ হিসেবে বি-ভ্যান মডেলের গাড়ির কথা বলেন। গাড়িটি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ বিনামূল্যের জ¦ালানি পাচ্ছে। সে হিসেবে বছরে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ বিনামূল্যে ভ্রমণ করা যাবে, এটা অনেক বড় সুবিধা।
যেখানে সুবিধা, সেখানেই তো মানুষ যাবে। তবে সূর্যের আলো কাজে লাগানোর বিষয়টি বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি এখানে রয়েছে পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার বার্তা। বিজ্ঞানীরা তো পৃথিবীকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে জীবাশ্ম জ¦ালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি তথা প্রাকৃতিক জ¦ালানি ব্যবহারের কথা বলছেন। তিউনিসিয়ার ব্যবসায়ীরা গাড়িশিল্পে সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে সে পথে হাঁটছেন। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বড় বড় দেশের সরকার ও বড় বড় ব্যবসায়ীরা পৃথিবীর স্বাস্থ্য তথা পরিবেশ দূষণ নিয়ে তেমন ভাবছেন না। মুনাফাই তাদের ঈশ্বর। পৃথিবী ও মানুষের স্বার্থ তাদের কাছে গৌণ। পুঁজিবাদের এই দানবীয় ভাবনায় সংস্কার প্রয়োজন। সবাইকে নিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচতে হলে এখন প্রয়োজন নৈতিক দর্শনের চাষাবাস।