সীমান্তে অস্ত্র পাচারের নেটওয়ার্ক ও নির্বাচনে নাশকতার প্রস্তুতি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে জাতীয় দৈনিকে। ২৮ ডিসেম্বর মুদ্রিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি এবং সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী অঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র অনুপ্রবেশের তৎপরতা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যমতে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় অবস্থানরত কয়েকজন পলাতক রাজনৈতিক নেতা ও সন্ত্রাসী এ অস্ত্র পাচারচক্রের নেপথ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে। তাদের নির্দেশনায় সীমান্তজুড়ে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পদ্মা নদী ও রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত ঘিরে গড়ে ওঠা এ অস্ত্র চোরাচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে অতীতে রাজশাহী অঞ্চলের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সংশ্লিষ্টতা ছিল। মামলা ও তদন্তের চাপে তারা ভারতে পালিয়ে গেছেন। সেখান থেকেই তারা বাংলাদেশে অবস্থানরত অনুসারী ও সহযোগীদের মাধ্যমে অস্ত্রপাচার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের ছত্রছায়ায় যারা অস্ত্র কারবারে যুক্ত ছিল, তাদের কেউ দেশে ফিরে সক্রিয় হয়েছে, কেউ বিদেশে থেকেই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে, কেউ আবার কারাগারে থেকেই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করছে। র্যাবের একটি সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন চক্র দেশি-বিদেশি অস্ত্র মজুত করছে। এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, অস্ত্রসহ যে কোনো অবৈধ পণ্যের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। গত ১৫ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের মনোহরপুর সীমান্ত থেকে বিজিবি চারটি বিদেশি পিস্তল, ৯টি ম্যাগাজিন ও ২৪ রাউন্ড গুলী উদ্ধার করেছে। লে. কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব অস্ত্র জব্দ করা হয়। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জব্দ করা অস্ত্রের গায়ে ‘জাপান’ বা ‘ইউএসএ’ লেখা থাকলেও অধিকাংশই ভারতের বিহারের মুঙ্গেরে তৈরি। বিদেশি নাম লেখা থাকলে অস্ত্রের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। এটা প্রতারণার একটা কৌশল মাত্র। এসব অস্ত্র প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন এলাকায় মজুদ করে পরে সীমান্ত পথে বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
পাচার কাজে সবজি ও ফলের চালান ব্যবহার করা হয়। বহনকারীদের বেশির ভাগই কিশোর ও যুবক। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কলকাতায় অবস্থানরত পলাতক নেতারা বাংলাদেশে তাদের পুরানো রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন। দেশের থাকা আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় নেতা-কর্মী অস্ত্রের ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, চালান পৌঁছে দেয়া এবং অর্থ লেনদেনে সহায়তা করছেন। রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও সীমান্তের আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহারের কারণে অস্ত্রের মজুদ বাড়ছে, যা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। এমন বাস্তবতায় পর্যবেক্ষকরা নির্বাহী বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছেন। তারা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও পাচাররোধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন। জুলাই বিপ্লবের পর দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের মুখে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওসমান হাদী হত্যার পর ষড়যন্ত্রের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারেরও বিষয়টি উপলব্ধি করার কথা। আশা করি সরকার সময়ের দাবি পূরণে এগিয়ে আসবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ব্লেমগেমের পরিবর্তে একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জাতি দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করে।