নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি গণতন্ত্রের চরিত্র, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক সহনশীলতারও একটি বড় পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে আমাদের আচরণ, বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় নারীদের প্রতি সমাজ ও রাজনীতির একাংশের দৃষ্টিভঙ্গি। সাম্প্রতি বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় অংশগ্রহণকারী নারী কর্মীদের ওপর হামলা, হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অপমানজনক আচরণের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে শারীরিক আক্রমণ, ব্যক্তিগত সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া এবং সামাজিকভাবে চরম লজ্জাজনক আচরণে বাধ্য করার মতো অভিযোগÑযা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে এভাবে দমন করার প্রবণতা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং সামাজিক সংহতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত।
রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয়তা কোনো সাময়িক বা নির্বাচনী আবেগের ফল নয়। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। সংগঠনের নির্দেশনা পালন, জনসংযোগ, সামাজিক কাজ এবং মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান ও প্রশংসনীয়। নির্বাচনের সময় সে ধারাবাহিক সক্রিয়তাই আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ সক্রিয়তাকে ইতিবাচক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে অনেক ক্ষেত্রেই তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বাস্তবতায় নারী কর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো, তাদের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা কিংবা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার প্রবণতা উদ্বেগজনক। নারীরা বাসায় গিয়ে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছেন- এমন অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সেগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনোই নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সম্মান হরণের বৈধতা দিতে পারে না।
এখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন সংক্রান্ত নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগÑএসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি জরুরি। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে সহিংসতা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াও অপরিহার্য।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়ও কম নয়। নেতাকর্মীদের প্রতি স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা থাকতে হবেÑনারীদের প্রতি কোনো ধরনের আক্রমণ, হেনস্তা বা অপমানজনক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনীতির মাঠে মতভিন্নতা থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা কখনোই সহিংসতা বা সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে যেতে পারে না। বিশেষ করে নারীদের প্রতি সহিংসতা সমাজে ভয়াবহ বার্তা দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বিভাজন আরও গভীর করে। এ কথাও মনে রাখা দরকার, অতীতে বিভিন্ন সময় বিশেষ করে সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর্বে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেনÑনির্যাতন, হয়রানি ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন অসংখ্য নারী। সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি একই ভুল আবার করা হয়, তবে তা হবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
নির্বাচনী পরিবেশকে নিরাপদ ও মানবিক রাখতে হলে নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো পক্ষের দয়া নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নারীদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা যেমন জরুরি, তেমনি তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই বিকশিত হয়, যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের হেনস্তা বন্ধ না হলে সেই সৌন্দর্য কেবল নস্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।