রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বর্তমানে তীব্র গ্যাস সঙ্কট চলছে। দিনের একটি বড় সময় পাইপ লাইনে গ্যাস থাকছে না। গ্যাস সঙ্কটের ফলে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়াসহ আবাসিক কাজে গ্যাস ব্যবহার করা যাচ্ছে না। প্রতি বছরই শীতের মৌসুমে গ্যাস সঙ্কট দেখা দেয়। তবে এবার সঙ্কটের মাত্রা অনেকটাই বেশি। অবস্থার কোন উন্নতি না হলে আগামীতে দেশের শিল্প-কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসবে। আগামীতে গ্যাস সঙ্কট আরো তীব্রতর হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির অনুমতি দিয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি সহজীকরণ করা হয়েছে। এখন থেকে এলপিজি আমদানিকারকগণ বায়ার্স ঋণের আওতায় বিদেশ থেকে বাকিতে গ্যাস আনার সুযোগ পাবেন। আগে শুধু শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল বাকিতে আমদানির সুযোগ ছিল। এলপিজিকে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। নতুন সিদ্ধান্ত মোতাবেক এখন থেকে এলপিজি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিবেচিত হবে। আমদানিকারকগণ বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় এলপিজি আমদানির সুযোগ পাবেন। আমদানির পর ২৭০ দিনের মধ্যে মূল্য পরিশোধের সুযোগ পাবেন। এতে এলপিজি আমদানিকারকগণ সহজে গ্যাস আমদানি করতে পারবেন। দেশে বর্তমানে প্রতি মাসে এলপিজি গ্যাসের মাসিক চাহিদা হচ্ছে গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টন। এর মধ্যে পরিবহন খাতে এলপিজি গ্যাসের মাসিক চাহিদা হচ্ছে ১৫ হাজার টন।

বিগত সরকার আমলে সরকারের অনুগত বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেবার জন্য বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানির সুযোগ দেয়া হয়। এলপিজি আমদানি এবং বাজারজাতকরণের এ বিশেষ গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পাশাপাশি এলপিজি আমদানি অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কোন বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় গ্যাস খাত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি বিশেষ মহল স্থানীয়ভাবে অভ্যন্তরীণ ভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যাপারে বড়ই উদাসীন। তারা বিশেষ উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি আমদানির প্রতি বেশি আগ্রহী। জ্বালানি বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান চালালে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। স্থানীয়ভাবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে ৩টি কূপ খনন অন্তত একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিকভাবে ৮ থেকে ১০টি কূপ খনন করা হলে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২৯টি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ৪ হাজার ঘনফুট। জরুরি ভিত্তিতে নতুন গ্যাস ক্ষেত্রে আবিষ্কৃত না হলে বর্তমানে যে গ্যাসের প্রমাণিত রিজার্ভ রয়েছে তা দিয়ে আগামী ৮ থেকে ১০ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে। এমতাবস্থায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা করা না গেলে আগামীতে বাংলাদেশকে আরো বেশি মাত্রায় আমদানিকৃত এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হবে। সম্প্রতি খোলা বাজারে প্রতি ইউনিট এলপিজির মূল্য ৫৫ থেকে ৫৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। একই পরিমাণ গ্যাসে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে খরচ হবে এক মার্কিন ডলারেরও কম।

এলপিজি আমদানি সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তি খাত নির্ভর হবার ফলে আমদানিকারকগণ নানা অজুহাতে যে কোন সময গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করে অতিরিক্তি মুনাফা লুটে নিতে পারতো। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। বিপিসি আপাতত শুধু এলপিজি আমদানি পর্যায়ে যুক্ত থাকবে। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ এবং বিতরণ কার্যক্রম আগের মতোই থাকবে। পর্যায়ক্রমে এসব ক্ষেত্রে বিপিসি যুক্ত হবে। সরকার গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) পদ্ধতিতে এলপিজি আমদানি করবে। এলপিজি আমদানির সম্ভাব্য উৎস হিসেবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও কাতারকে নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব দেশ থেকে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতায় এলপিজি আমদানি করা হবে।

কাতার, কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এলপিজির বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সরকার পরবর্তীতে এসব দেশ থেকেও এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করবে। সরকারের এই উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে এলপিজির মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতায় এলপিজি আমদানি করা হলে হঠাৎ করে মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে না। তবে এ মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য এলপিজি আমদানি করা হলেও দীর্ঘস্থায়ী চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের অবশ্যই নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া যেসব গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে তার অনেকগুলোই পূর্ণ মাত্রায় উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়নি। এগুলো থেকে পূর্ণ মাত্রায় গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে।