নওগাঁর বদলগাছীতে চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন ৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। খবরটি নিছক একটি জেলার আবহাওয়ার তথ্য নয়; এটি সারাদেশের শীতের ভয়াবহতার প্রতিচ্ছবি। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য অঞ্চল পর্যন্ত হিমেল হাওয়ার দাপটে বিপর্যস্ত জনজীবন। ঘন কুয়াশা, সূর্যহীন সকাল আর রাতভর কনকনে ঠা-া-সব মিলিয়ে এ শীত এখন শুধু প্রকৃতির অনুষঙ্গ নয়, বরং দরিদ্র মানুষের জীবনে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

এ শীত সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। রিকশাচালক, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা ফুটপাতবাসীÑ তাদের অনেকেরই নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র, নেই ঘরের ভেতর উষ্ণ পরিবেশ। ভোরে কাজে বের হওয়া মানুষদের শরীর কাঁপলেও জীবিকার তাগিদে বেরোতেই হয়। ফলে শারীরিক দুর্বলতা, অসুস্থতা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস-সব মিলিয়ে আয় কমে যাচ্ছে, বাড়ছে অনিশ্চয়তা। এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য দরিদ্র মানুষের জীবনকে আরও সংকুচিত করেছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি-সব কিছুর দামই এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, অনেক পরিবার এখন খাবার ও উষ্ণ পোশাকের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। একটি কম্বল বা মোটা জামা কেনার সামর্থ্য নেই- এ নির্মম বাস্তবতায় শীত তাদের কাছে শুধু ঠা-া নয়, এটি হয়ে উঠছে লজ্জা, অপমান ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের নাম।

শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঠা-াজনিত রোগব্যাধি। শিশুদের নিউমোনিয়া, বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগের জটিলতা, সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বর-সবই বেড়ে যায় এ সময়টায়। গ্রামাঞ্চলে ও বস্তিগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না থাকায় এসব রোগ অনেক সময় প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। অথচ প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ উপায়-শীতবস্ত্র, উষ্ণ আশ্রয় ও মৌলিক চিকিৎসাÑএসবেরই রয়েছে তীব্র ঘাটতি।

প্রতি বছর শীত আসে, প্রতি বছর আমরা সংবাদপত্রের পাতায় শীতার্ত মানুষের ছবি দেখি, কিন্তু বাস্তবে টেকসই কোনো সমাধান চোখে পড়ে না। সরকারি ত্রাণ ও শীতবস্ত্র বিতরণ অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে শুরু হয়, প্রয়োজনের তুলনায় পরিমাণ থাকে অপ্রতুল এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো নিয়েও থাকে নানা অভিযোগ। এ অব্যবস্থাপনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি মানবিক দায়বদ্ধতার অভাবেরও প্রতিফলন। এ পরিস্থিতিতে সরকারের জরুরি ও সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। জাতীয় পর্যায়ে শীতবস্ত্র সংগ্রহ, দ্রুত বিতরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী শীতকালীন দুর্যোগ মোকাবিলা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে শীতকালীন রোগ মোকাবিলায় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসাসেবাকে শক্তিশালী করতে হবে।

তবে শুধু রাষ্ট্রের পক্ষে একা সব করা সম্ভব নয়। সমাজের বিত্তবান মানুষ, ব্যবসায়ী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। একটি কম্বল, একটি সোয়েটার কিংবা সামান্য ওষুধ-এ ছোট উদ্যোগই হতে পারে কারও বেঁচে থাকার অবলম্বন। হাড়কাঁপানো শীতে আমাদের সামনে একটি নৈতিক প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে-আমরা কি কেবল নিজেদের উষ্ণতায় ব্যস্ত থাকব, নাকি শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াব? আমরা মনে করি, সমাজের প্রতিটি সচেতন, বিবেকবার ও বিত্তশালী মানুষের এ শীতে সক্রিয় হওয়া উচিত। কেবল নিজের শীত উপশম নয়, বরং কম্বলসহ শীতবস্ত্র নিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের কাছে ছুটে যাওয়া উচিত। এটাই বিবেকের দায়, নৈতিকতার অপরিহার্য দাবি।