গত ১৮ ডিসেম্বর বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও অন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস পালিত হয়েছে। এবারের দিনটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গরবো দেশ।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এক সময় বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যেতেন। তবে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষভাগে এসে বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক হারে কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি খাত।

এখনো পণ্য রপ্তানি বাবদ সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। তবে এক অর্থে জনশক্তি রপ্তানি খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানি খাতের চেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়। কারণ পণ্য রপ্তানি খাতে প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি বাবদ পুরনায় বিদেশে চলে যায়। ফলে এ খাত থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন হয় তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু জনশক্তি রপ্তানি খাত থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। কারণ এ খাতরে জন্য কোন উপকরণ আমদানি করতে হয় না।

উপরন্তু প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসী আয় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৬৮টি দেশে কর্মী প্রেরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি মুসলিম দেশে জনশক্তি রপ্তানি করা হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এসব দেশের চেয়ে ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলে জনশক্তি রপ্তানি করা হলে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের বিকল্প বা নতুন শ্রম বাজার খুঁজে বের করতে হবে। সীমিত সংখ্যক দেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে আমরা উন্নত দেশগুলোর চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জনশক্তি রপ্তানি করতে পারছি না। বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে কর্মসংস্থান উপলক্ষে গমন করেন তাদের বেশির ভাগই অদক্ষ শ্রমিক। ফলে তারা বিদেশে গিয়ে উপযুক্ত মজুরি পান না। দক্ষ শ্রমিক এবং পেশাজীবীদের বিদেশে প্রেরণ করা গেলে এ খাতের আয় অনেকগুন বাড়তে পারে।

২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৪৫ কর্মী বিদেশে গমন করেন। এদের মধ্যে দক্ষ কর্মী ছিলেন মাত্র ৬১ হাজার ৬২৪ জন বা ২৩ শতাংশ। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৩ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থান উপলক্ষে বিদেশে গমন করে যাদের মধ্যে দক্ষ কর্মী ছিলেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ১৯০ জন বা ২০ শতাংশ। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে মোট ১১ লাখ ২৬ হাজার ০৬০ জন বিদেশগামী বাংলাদেশির মধ্যে দক্ষ কর্মী ছিলেন ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬৪৬জন বা ২৫ শতাংশ। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০ জন বিদেশগামী বাংলাদেশির মধ্যে দক্ষ কর্মী ছিলেন ৩ লাখ ০৬ হাজার ০৯৪জন বাং ২৬ শতাংশ। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে মোট ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থান উপলক্ষে বিদেশে গমন করেন। এদের মধ্যে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৭জন বা ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশ থেকে দক্ষ এবং বিদেশি ভাষা জানা কর্মী এবং পেশাজীবী প্রেরণ করা গেলে এ খাতের অর্জন আরো অনেক বেশি বাড়ানো সম্ভব। জনশক্তি রপ্তানি খাতের আয় বাড়ানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করে গড়ে তোলা যেতে পারে। বিগত সরকার আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুল নীতির কারণে জনশক্তি রপ্তানি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণ করে রেখেছিল। ফলে বৈধ চ্যানেলের সঙ্গে কার্ব মার্কেটে প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্যের পার্থক্য দাঁড়ায় ১০ থেকে ১২ টাকা। বাড়তি অর্থ পাবার প্রত্যাশায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করতে থাকে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ম্যানেজমেন্ট মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ কমিয়ে দেয়। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন মার্কিন রেমিট্যান্স আহরণ করতে সক্ষম হয়েছে। জনশক্তি রপ্তানি খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।