সারাবিশ্বে যখন খ্রীস্টানরা আনন্দ আয়োজনে ব্যস্ত, তখন ভারতে বড়দিনের আনন্দে নেমে এসেছে কালো মেঘের ছায়া। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উগ্র হিন্দুরা হামলা চালাচ্ছে খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের ওপর। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, বড়দিন উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লির এক গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করলেন। অথচ তাঁর দল ও সরকারের সমর্থক উগ্র হিন্দুত্ববাদীগোষ্ঠীর সদস্যরা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ করলো, ধর্ম পালনে বাধা দিলো। এমন দ্বিচারিতা কেন? আগে ভারতে মুসলমানদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রদায়িক হামলা, জুলুম-নির্যাতনের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা গেছে; এখন তা শুরু হলো খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের ওপরও। এমন আচরণের মাধ্যমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএস এবং শাসকদল বিজেপি কী এমন বার্তাই দিতে চাচ্ছে যে, ভারতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মানবাধিকার বলতে কিছু থাকবে না। এমন বাস্তবতায় ভারত নিজেদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবি করবে কোন বিবেচনায়? মোদি সরকারের আমলে ভারতীয় সমাজে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উগ্র কর্মকাণ্ড চলছে, তাতো দেশটির সাংবিধানিক বয়ানের সাথে সাংঘর্ষিক, তারপরও ওসব কর্মকাণ্ড কেমন করে চলছে? মোদি সরকার কি অর্পিত সাংবিধানিক কর্তব্য পালনে আগ্রহী নয়? আর ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ দর্শনের কথাও কি ভুলে গেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার?
বড়দিনে ভারতে বড় আক্রমণ চালানো হয়েছে বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, আসাম ও হরিয়ানায়। অবাক ব্যাপার হলো, এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলার ব্যাপারে সাধারণ প্রতিবাদটুকু পর্যন্ত করেনি বিজেপি। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি। বিবৃতি দেয়ার সৌজন্যও প্রকাশ করা হয়নি। হামলাকারী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, বরং দিল্লির আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতাদের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ এফআইআর দাখিল করেছে। অভিযোগ, দিল্লির সাবেক শাসক দলের (এএপি) নেতারা খ্রীস্টানদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছেন। ভারতে বিজেপির রাজনীতিতে এখন এ ধরনের চাতুর্যই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতে খ্রীস্টানদের ওপর হামলা বেড়েছে। এমন হামলায় বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আসাম রাজ্যের নলবাড়িতে একটি খ্রীস্টান মিশনারি স্কুলে বড়দিনে তাণ্ডব চালায় হিন্দুত্ববাদী বজরং দল। এ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বিভিন্ন রাজ্যে বড়দিন উদযাপনের বিরুদ্ধে উগ্র অবস্থান নেয়। একই ধরনের ঘটনা ঘটে ২৪ ও ২৫ ডিসেম্বর দেশের বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে। তারা বিপণি বিতান, স্কুল, দোকান, এমনকি উৎসবমুখর মানুষদের ওপরও হামলা চালায়।
খ্রীস্টানদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ সংসদ সদস্য শশী থারুর বলেছেন, খ্রীস্টানদের পাশে প্রত্যেকের দাঁড়ানো উচিত। তিনি বলেন, ‘ঐতিহ্যের ওপর যখন আক্রমণ নেমে আসে, তখন শুধু খ্রীস্টানরাই নয়, আক্রান্ত হই আমরা সবাই।’ শশী থারুর আরও বলেন, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের উচিত এ ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে সরব হওয়া। শশী থারুর তো আহ্বান জানালেন, কিন্তু সে আহ্বানে সাড়া নেই বরং বিজেপি শাসিত উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে গঙ্গার ধারে রাজ্য পর্যটন দফতর পরিচালিত এক হোটেলে বড়দিনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতে খ্রীস্টানদের ওপর আক্রমণের ঘটনা বেড়ে গেছে।
ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়ার (ইএফআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে খ্রীস্টানদের ওপর নির্যাতন ও আক্রমণের ১৭৭টি ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ৩০০টি। অলইন্ডিয়া খ্রীস্টান কাউন্সিল জানিয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে ভারতে প্রতি ৪০ ঘণ্টায় একটি করে আক্রমণের ঘটনা ঘটছে খ্রীস্টানদের ওপর। পারসিকিউশন রিলিফ নামের একটি ভারতীয় সংস্থার হিসেবে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত খ্রীস্টানদের ওপর আক্রমণের হার বেড়েছে ৬০ শতাংশ। ২০২২ সালের প্রথম সাত মাসে ভারতে মোট ৩০০টি ঘটনায় খ্রীস্টানরা আক্রান্ত হয়েছেন। পরিসংখ্যান আরো আছে। মুসলমানদের ওপরও আক্রমণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। প্রশ্ন হলো, সংখ্যালঘুদের ওপর হিন্দুত্ববাদীদের উগ্র আচরণ ও আক্রমণ কি ভারতের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে? মোদি মহোদয় কি বিষয়টি বুঝতে অক্ষম?