ইসলামের বিধিবিধান নিয়ে মুসলমানদের যে পর্যায়ে, যে মাত্রায়, সচেতন ও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন ছিল; তা সেভাবে নেই। অথচ মুসলমানরা বিশ্বাস করেন যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এই যে কমতি, খামতি-এর রয়েছে নানা কারণ। তবে পবিত্র রমযানে মুসলমানরা নিজেদের চিনতে চায়, বুঝতে চায়। আত্মঅন্বেষণের কিছু তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়। আমরা জানি, ইসলামের মূল পাঁচটি স্তম্ভের দু’টি হলো সিয়াম ও যাকাত। রমযানে এ দু’টি বিষয় নিয়ে অনেক কথা হয়, এ নিয়ে সাধারণ, অসাধারণ সবাই কিছু না কিছু বলেন। এমন বলার একটা গুরুত্ব আছে, আর বলাটা যদি হয় দেশের প্রধামন্ত্রীর-তাহলে তো গুরুত্বটা অনেক বেড়ে যায়। দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে জাকাত দেওয়া হলে ১০-১৫ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দেশে দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দেশের সম্মানিত ওলামা-মাশায়েখ এবং এতিমদের সম্মানে আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির একটি হচ্ছে জাকাত। দেশে জাকাত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমার একটি পরিকল্পনা শেয়ার করতে চাই। ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমাদের সমাজে অনেক বিত্তবান নিজ উদ্যোগেই জাকাত দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ সরকারের ‘জাকাত বোর্ডের’ মাধ্যমেও জাকাত পরিশোধ করে থাকেন। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রতিবছর বাংলাদেশ এই জাকাতের পরিমাণ ২০-২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে থাকে। কেউ কেউ এর পরিমাণ আরো অনেক বেশি বলেছেন। তবে সুপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিতভাবে জাকাত বন্টন না করায় বিত্তবান ব্যক্তির জাকাত আদায় হয়ে গেলেও, জাকাতের অর্থ দারিদ্র্যবিমোচনে কতটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। তারেক রহমান বলেন, জাকাত দাতাদেরকে ইসলামী বিধান এমনভাবে জাকাত বন্টনে উৎসাহিত করে, যাতে একজন জাকাত গ্রহীতা প্রথম বছর জাকাত গ্রহণের পর পরের বছর তাকে আর জাকাত নিতে না হয়। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, পরিকল্পিতভাবে জাকাত বন্টন করা গেলে দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এমন বাস্তবতায় সরকার জাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধনী-দরিদ্র সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা কমবেশি চার কোটি। এসব পরিবারের মধ্যে দরিদ্র কিংবা হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে প্রতিবছর যদি পর্যায়ক্রমে ৫ লাখ পরিবারকে এক লাখ টাকা করে জাকাত দেওয়া হয়, আমার বিশ্বাস এসব পরিবারের মধ্যে বেশিরভাগ পরিবারকে পরের বছর আর জাকাত নাও দিতে হতে পারে। ওলামা-মাশায়েখদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আপনাদের কাছে যৌক্তিক মনে হলে এ ব্যাপারে বিত্তবানদের সচেতন করার ক্ষেত্রে আপনারা সবেচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে পারেন। জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনে শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা, ইসলামিক স্কলার এবং সরকারি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যমান ‘জাকাত বোর্ড’কে পুনর্গঠন সম্ভব। জাকাতকে দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যবহার করে ইসলামী বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে।
জাকাতের উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনের যে আকাক্সক্ষা প্রধানমন্ত্রী ব্যক্ত করেছেন তা খুবই সঙ্গত বলে আমরা মনে করি। সংশ্লিষ্ট সবাই উদ্যোগ নিলে দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশ একটি মডেল রাষ্ট্র হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দারিদ্র্যবিমোচনের এই চিন্তাকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া এবং উদ্যোগকে অব্যাহত রাখা। রমযানের পবিত্র পরিবেশেই এই আলোচনা যেন সীমাবদ্ধ না থাকে। সারা বছরই যেন এ নিয়ে কাজ হয়। এবার প্রধানমন্ত্রী দারিদ্র্যবিমোচন নিয়ে যেভাবে আলোচনা করলেন, তার একটা বাস্তব প্রতিফলন সম্ভব বলে আমরা মনে করি।