বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি। আদালত ও বিচারপ্রক্রিয়া কেবল আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র নয়, বরং ন্যায় ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। তাই বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় কারাবন্দী সাবেক এক সংসদ সদস্যকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য একজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবি করার অভিযোগ সামনে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিংও রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম যাচাই করেছে। অভিযোগ ওঠার পর ওই প্রসিকিউটর ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ ঘটনা স্বভাবতই জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো সংবেদনশীল একটি বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে এ ধরনের অভিযোগ যুক্ত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কেবল আইনগত প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ ধরনের বিচারপ্রক্রিয়াকে ঘিরে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এর সঙ্গে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠলে তা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা অমূলক নয়। বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত স্বার্থে আইনকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, তবে তা শুধু নৈতিক অবক্ষয়ের পরিচয়ই দেয় না; একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়াকেও দুর্বল করে দেয়। বিচারপ্রক্রিয়ার ভেতরে দুর্নীতি ঢুকে পড়লে অপরাধীরা শাস্তি এড়ানোর সুযোগ পেতে পারে, আর নিরপরাধ মানুষেরাও অন্যায়ের শিকার হতে পারেন।

এমন প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা। যে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের দায়িত্ব হবে নিরপেক্ষভাবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা। তদন্ত প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালিত হতে হবে যাতে জনগণের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা থাকে এবং কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগের কারণে পুরো বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়। তবে এমন অভিযোগকে অবহেলা করা বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে সেটি আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থেই এ ধরনের অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী আমলে সংঘটিত হওয়া নানা ধরনের অন্যায় ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দেখার জন্য জনগণ উম্মুখ হয়ে আছে। আর এ ধরনের বিচারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা শুধু আইনি বিচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা চায় ন্যায়বিচার হোক স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত। সে প্রত্যাশা পূরণ করা বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। সুতরাং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ দেশের পুরো বিচারব্যবস্থাকে দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত রাখতে হলে কঠোর জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অসদাচরণ শুধু অনাকাক্সিক্ষতই নয়, তা রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। তাই এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আপস বা নমনীয়তার কোনো সুযোগ নেই। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।