চলে গেলেন জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক, ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদী (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সবাইকে কাঁদিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সেখানে জেনারেল হাসপাতালে তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয় তার পরিবারের মতামতের ভিত্তিতে। গত ১২ ডিসেম্বর বিকেলে বিজয়নগর সড়কে (পল্টন) নির্বাচনী প্রচারণা শেষে ফেরার পথে ঘাতকের গুলিতে তার মস্তিষ্ক অকার্যকর হয়ে পড়ে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অধিকতর ভালো চিকিৎসার জন্য সেদিনই রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঢাকায় মস্তিষ্কের সংক্রমণ কমাতে না পেরে সরকার তাকে গত ১৫ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে পাঠায় আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা মস্তিষ্ককে কার্যকর করতে পারেননি তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ মেশিনের সাহায্যে সাড়া দেয়ার পরও। ফলে শাহাদাতই অনিবার্য হয়ে ওঠে।

জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল ওসমান হাদী আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। কিন্তু তা আর হলো না। মহান আল্লাহ তার শাহাদাত কবুল করেছেন। ওসমান হাদীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে লেখা হয়েছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদীকে আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন। শরিফ ওসমান হাদী ১৯৯৩ সালে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ওসমান হাদির শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঝালকাঠির বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসায়। সেখান থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করে তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এ প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনার্স ও মাস্টার্স করেন। ছাত্রজীবন শেষ করার পর হাদি মহান পেশা শিক্ষকতাকে বেছে নেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি একটি স্বনামধন্য কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করেন, যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শরিফ ওসমান হাদি এক সন্তানের জনক। পরিবার, শিক্ষকতা ও জ্ঞানচর্চাকে ঘিরেই বর্তমানে তার প্রাত্যহিক জীবন আবর্তিত হতো।

ওসমান হাদী ছিলেন ২০২৪ এর ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা। জীবনবাজি রেখে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। বিদেশী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। সে কণ্ঠ তিনি সংসদে বুলন্দ করার মানসে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। আর সে কারণেই পতিত স্বৈরাচারের ক্রীড়নকরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার ওপর হামলা চালায়। ১২ ডিসেম্বর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ একটি মোটরসাইকেলে করে বিজয়নগর সড়কে তার মাথা উদ্দেশ্য করে গুলি করে পালিয়ে যায়। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল আলমগীর কবির নামে তার সহযোগী। কিন্তু তাদেরকে এখনো আটক করা যায়নি। তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে বলেও খবর। প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক, তাদের গ্রেফতার ও শাস্তি দেয়া হোক এটা দেশবাসীর দাবি।

আশার কথা, হাদীর মৃত্যুর পর সবাইকে ধৈর্য ও সংযমের আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সব অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন। শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে তিনি শোককে শক্তিতে পরিণত করার আহ্বান জানান। সিঙ্গাপুরে হাদীর মৃত্যুর খবর আসার পর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ওসমান হাদির স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এ অমর সৈনিককে মহান রাব্বুল আলামিন শহীদ হিসেবে কবুল করুন- এ দোয়া করি।’ প্রধান উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। হাদীর মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা মনে করি তার শাহাদাত দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিসরে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার শাহদাতের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। ৫ আগস্টের পর যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল। আমার মনে হয় এ ঐক্য ধরে রাখা জাতির জন্য খুবই প্রয়োজন। অন্যথায় আধিপত্যবাদ মাথাচারা দেবে।

আমরা হাদীর শোকসন্তপ্ত স্ত্রী, পরিবারের সদস্য, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। সে সাথে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সব অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাই। আমরা চাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এ ব্যাপারে যে ঘোষণা দিয়েছেন তা বাস্তবায়িত হোক।