১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক তৎপরতা, বিতর্ক এবং প্রত্যাশাÑসবই এখন তুঙ্গে। নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, জনগণের আস্থা এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের নির্ণায়ক। তাই এ নির্বাচন হতে হবে কালো টাকা, নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রশাসনিক প্রভাবমুক্তÑএটাই এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে-অবৈধ অর্থের ব্যবহার, পেশিশক্তির প্রদর্শন, ভোটকেন্দ্র দখল, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ কিংবা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন। এসব অনিয়ম শুধু একটি দল বা প্রার্থীর ক্ষতি করে না; বরং পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দেয়। ভোটারদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হলে গণতন্ত্রের ভিত নড়ে যায়, অংশগ্রহণ কমে যায়, এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক তৈরি হয়।
কালো টাকার ব্যবহার নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি। অর্থের অস্বচ্ছ প্রবাহ প্রার্থীদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে, যোগ্যতার বদলে আর্থিক শক্তিকে প্রাধান্য দেয়। এতে রাজনীতি ক্রমশ সৎ ও আদর্শবাদী মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রার্থীদের আয়-ব্যয়ের হিসাব কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংÑঅর্থাৎ ভোটের ফলাফল প্রভাবিত করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা-গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি।ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব বা অস্বচ্ছতা, কিংবা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার অপব্যবহার-এসবের যেকোনোটি জনগণের আস্থা নষ্ট করতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে তাই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার যদি হয়, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ, নিরীক্ষাযোগ্য এবং সর্বদলীয় আস্থাভাজন।
প্রশাসনের নিরপেক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আচরণে যদি পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে পুরো নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনের একমাত্র দায়িত্ব হবেÑসমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা বিধান। কোনো দল বা প্রার্থীর প্রতি বিশেষ সুবিধা কিংবা হয়রানিÑউভয়ই গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসংযম প্রয়োজন। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সহিংসতা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও অপপ্রচার থেকে সরে এসে নীতিনির্ভর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবেÑতথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন, নজরদারি এবং জনমত গঠনের মাধ্যমে।
সবচেয়ে বড় কথা, ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ছাড়া কোনো নির্বাচনই সফল হতে পারে না। ভোটার যেন নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন এবং নিশ্চিত থাকতে পারেন যে তাঁর ভোট সঠিকভাবে গণনা হবেÑএ বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারেÑযদি তা সত্যিকার অর্থে কালো টাকা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হয়। অন্যথায় এটি আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করবে। দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষেরÑরাষ্ট্র, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে নির্বাচনের পবিত্রতা রক্ষা করতেই হবে। কারণ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে জনগণের ইচ্ছাকে রাষ্ট্রশক্তিতে রূপান্তরিত করতেÑএবং সেটিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সাফল্য।