দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের যে ভয়াবহ চিত্র সম্প্রতি সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে-যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য এক অশনিসংকেত। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ এ সংকটের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এ তালিকা প্রকাশ যেমন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তেমনি এটি প্রমাণ করে যে, সমস্যাটি সীমিত নয়Ñবরং গভীরভাবে প্রোথিত।

ব্যাংকিং খাত একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এ খাতের ওপরই নির্ভর করে শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি। কিন্তু যখন ঋণ বিতরণ হয় অনিয়মের মাধ্যমে এবং তা ফেরত আসে না, তখন পুরো ব্যবস্থাটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। খেলাপি ঋণের এ উচ্চমাত্রা প্রমাণ করে যে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-প্রভাবশালী মহল ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্রহণ এবং তার একটি বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হওয়া। এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং নৈতিক অবক্ষয়েরও ইঙ্গিত বহন করে। যখন সাধারণ মানুষ ক্ষুদ্র ঋণের জন্যও কঠোর শর্তের মুখোমুখি হয়, তখন প্রভাবশালীদের ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়ার প্রবণতা সামাজিক বৈষম্য ও অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি, শীর্ষ খেলাপিদের ওপর নজরদারি এবং বিশেষ কৌশল গ্রহণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। একইভাবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্তকরণ ও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নির্দেশনাও সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে বাস্তবতা হলোÑনীতিমালা প্রণয়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর বাস্তবায়ন। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঋণ আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হতে পারে, যদি তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক ক্ষেত্রেই এসব উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ফলে কাক্সিক্ষত ফল অর্জিত হয় না।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে না থাকতে পারে। তৃতীয়ত, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও আইন বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কার্যকর হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। ঋণখেলাপীদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো বা তাদের রক্ষা করার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, এর বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকেইÑমুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার এবং বিনিয়োগ সংকোচনের মাধ্যমে। অতএব, খেলাপি ঋণ আর কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য একটি বড় বাধা। তবে মূল প্রশ্ন থেকে যায়Ñএসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক সময়ই কঠোর নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগে দুর্বলতা থেকে যায়। ফলে বড় ঋণখেলাপিরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়, আর বোঝা পড়ে ব্যাংকিং খাত ও সাধারণ আমানতকারীদের ওপর।

সবশেষে বলা যায়, ঋণখেলাপি সমস্যা আর কেবল একটি আর্থিক ইস্যু নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। শীর্ষ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ এবং বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেÑএখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এ সংকট আরও গভীর হবে, যার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকেই।