যুদ্ধের গতিপথ সবসময় সরল থাকে না। যুদ্ধে উত্থান থাকে, পতন থাকে। বিভ্রান্তি থাকে এবং মিথ্যাচারও থাকে যুদ্ধে। যুদ্ধের কথাবার্তায়ও তাল-লয় ঠিক থাকে না। আর ট্রাম্পের মত অস্থির ও দাম্ভিক কোনো ব্যক্তি যদি যুদ্ধটা শুরু করেন তাহলে সেখানে কোনো গ্রামার না থাকারই কথা। যুদ্ধের ১০ম দিনে এসে ট্্রাম্প বললেন, যুদ্ধ থেমে যাবে। ইরান বললো, ও যুদ্ধ থামাবার কে; যুদ্ধের পরিণতি আমরা ঠিক করবো। যুদ্ধের আবহাওয়ায় এমন বাকযুদ্ধ মন্দ নয়। তবে এসব নয়, যুদ্ধ বন্ধটাই মানুষের কাছে আসল। কারণ মারণাস্ত্রের এই সভ্যতায় মানুষ মানবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত, স্বাভাবিক জীবনযাপন মানুষের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। এর উপর যুদ্ধের ভার বইতে মানুষ অসমর্থ। ফলে মানুষ চায় যুদ্ধ বন্ধ হোক।
যুদ্ধের লক্ষ্য থাকে, লক্ষ্য ভুল হতে পারে-তবে যুদ্ধে লক্ষ্য থাকে। যুদ্ধবাজদের কথা থেকে সবসময় যুদ্ধের আসল লক্ষ্য বোঝা যায় না। ট্রাম্প ইরানে হামলা চালালো কেন? মুখেতো অনেক উত্তম বয়ান-ইরানি জনগণের উপর থেকে স্বৈরশাসন উঠে যাক, ওরা গণতন্ত্রের স্বাদ পাক। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ট্রাম্প-ওরা কি আসলেই মানুষের জীবনযাপন নিয়ে ভাবে, বিশ্বকে নিয়ে ভাবে? ওদের এসব বয়ানে মানুষ হাসে এবং অবজ্ঞা করে। মানুষ মনে করে, ট্রাম্পের আসল লোভ তেলে। আর ইসরাইলকে নিয়ে আধিপত্য বিস্তারের একটা সাম্রাজ্যবাদী বিকার তো ট্রাম্পের মস্তিষ্কে আছেই। ওদের অশুভ ও জংলি কর্মকাণ্ডে নেতৃত্বের কোনো বাহার নেই, আছে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করার মত সহস্য উপাদান। ট্রাম্পের লক্ষ্য সম্পর্কে তো কমবেশি জানা যায়। কিন্তু চলমান যুদ্ধ থেকে ইরান কি পেতে চায়? ইরান কি যুদ্ধে ট্রাম্পকে হারাতে চায়, নাকি আত্মরক্ষা করতে চায়? এমন কি হতে পারে যে, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে রেখে উপসাগরীয় তথা র্আও রাষ্ট্রগুলোকে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করার কৌশল নিয়েছে ইরান। আল-জাজিরাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত বিশ্লেষণ লক্ষ্য করা গেছে। আমরা জানি, ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এমন ঘটনায় উপসাগরীয় দেশগুলো কিন্তু কোনো উল্লাস প্রকাশ করেনি। বরং তারা আশঙ্কার সঙ্গে ‘অপরাশেন এপিক ফিউরি’ নামের সামরিক অভিযানটিকে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা এমন পরিস্থিতি কামনা করেনি, বরং বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতি ঠেকানোর জন্য তারা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলো।
আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের সঙ্গে আলোচনা বজায় রেখেছে, দূতাবাস চালু রেখেছে এবং বারবার এই আশ্বাস দিয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ডকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ‘লঞ্চপ্যাড’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এর বিপরীতে ইরান কি করলো? ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলো, তা শুধু ঐতিহাসিক ও কৌশলগত ভুলই নয়, বরং চরম নৈতিক ও বেআইনি পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হবে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। ইরানের এমন পদক্ষেপ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সম্পর্ক বিষিয়ে তোলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়, উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সদস্য দেশগুলো ইরানের শত্রু হিসেবে বর্তমান সংকটে জড়ায়নি; বরং বছরের পর বছর ধরে তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দ্বন্দ্বে অত্যন্ত সচেতনভাবে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে সৌদিআরব আলোচনার পথ বেছে নেয় এবং তেহরানের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়। সেই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ ছিল-২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি সম্পাদন এবং আবার দূবাতাস চালু। তখন রিয়াদের ভাষ্য ছিল-সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমেই স্থিতিশীলতা সম্ভব। আর বর্তমান সংকট যখন ঘণীভূত হচ্ছিল, তখনো সৌদি আরব স্পষ্টভাবে তেহরানকে নিশ্চিত করেছিল যে, ইরানের ওপর হামলা চালাতে তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড কাউকে ব্যবহার করতে দেবে না। সৌদি আরব তার কথা রেখেছে, কিন্তু বিনিময়ে প্রাপ্য সম্মানটুকু তারা পায়নি ইরান থেকে। আমরা জানি, শান্তির লক্ষ্যে বছরের পর বছর মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে গেছে কাতার। তারা হামাস ও ইসরাইল এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে। যখন খুব কম দেশই এগিয়ে এসেছিল। তখন দোহা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার আয়োজন করেছিল এবং কূটনৈতিক সমাধানের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছিল। অন্যদিকে নিভৃত মধ্যস্থাকারী ওমানের আলোচনার ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত একটি চুক্তির ক্ষীণ আশা বেঁচে ছিল। বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ার আগের দিন ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি শান্তি ‘হাতের নাগালে’ আছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। ইরান নিজেও জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর আন্তরিকতাকে পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছে। ৫ মার্চ তেহরান প্রকাশ্যে সৌদি আরবের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তেহরানের এমন স্বীকৃতি ইরানের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে স্ববিরোধী ও অমার্জনীয় করে তুলেছে।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর দীর্ঘদিনের সদিচ্ছার বিনিমেয় ইরানের বর্তমান প্রতিক্রিয়া খুবই ভয়ঙ্কর। আমেরিকা ও ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুর ওপর চালানো হামলার চেয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার মাত্রা অনেক বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধ শুরুর দিনগুলোয় ইরান ও ইসরাইলের তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে দ্বিগুণের বেশি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ২০ গুণ বেশি ড্রোন ছুড়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌম ভ’খেন্ড এই হামলা কেবল কৌশলগতভাবেই ভুল নয়, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও তা অবৈধ। তেহরান এসব হামলাকে বৈধতা দিতে যুিক্ত দেখিয়েছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির কারণে ওই দেশগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়েছে। তবে এমন বক্তব্য যুক্তি বা আইনের দৃষ্টিতে টেকে না। উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে যেকোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্রের চাইতে কাতারের সম্পর্ক ছিল উত্তম ও দীর্ঘস্থায়ী। সেই কাতার এখন ইরানের এসব হামলাকে বলছে ‘বেপরোয়া’ ও ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’।
ইরানকে এখন ফেরার পথ খুঁজতে হবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধৈর্যশীল ও নিরবিচ্ছিন্ন কূটনীতির মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রমাণ করেছে যে, ইরানের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কই ছিল তাদের প্রধান পছন্দ।
ইরান সেই পছন্দের জবাব দিয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে। ইরানের একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, তারা যে প্রতিবেশীদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে, তারাই তাদের মধস্থতা-দক্ষতা এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারতো। এখনো ইরানের কাছে ফেরার পথ আছে। তবে রাজনীতির ভুল পথে গেলে, ভুল কৌশল অবলম্বন করলে ইরানের সংকট আরো বেড়ে যেতে পারে।
ইরানযুদ্ধে শুধু ইরানের নয় ট্রাম্পের তথা যুক্তরাষ্ট্রেরও সংকট বাড়ছে। ইরানের সাথে ট্রাম্পের যুদ্ধ তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি সমর্থকদের সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে ট্রাম্প বিদেশে হস্তক্ষেপের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ইরানে হামলার এক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে ‘অপারেশন এপিক ফিউরির’ প্রতি দলীয় সমর্থন বিভক্ত হয়ে গেছে বলে জানায় আরটি। ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাবে কিনা, সে প্রশ্নে কংগ্রেসে ভোটাভুটি হয়েছে। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সিএনএনের জরিপে দেখা যায়, ৭৭ শতাংশ রিপাবলিক যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন, আর ডেমোক্রেটদের মধ্যে যুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছেন মাত্র ১৮ শতাংশ। যুদ্ধের সম্ভাব্য সময়সীমা এবং বিজয়ের সম্ভাবনা নিয়েও ট্রাম্পে প্রশাসনের কর্মকর্তারা একমত হতে পারেননি। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্থন না করলে যুদ্ধ অনন্তকাল চলতে পারে। আর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জনসাধারণকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ট্রাম্প কখনোই দেশের মানুষকে অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধের দিকে ঠেলবেন না। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সাথে যুদ্ধ করছে, তখন তাদের মতপার্থক্য আর কথার মধ্যে থেমে নেই। স্পষ্ট বিভাজন দেখা গেছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দলের মধ্যে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের আগ্রহের জায়গাটা খুবই স্পষ্ট।আমরা ্্্্্্্ইরানেে সাথে যুদ্ধে যেতে চাই না। এতে অনেক সম্পদ নষ্ট হবে। আমাদের দেশের জন্য এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।’ বিষয়টি আমেরিকা ফাস্ট’ নীতির সাথে সাংঘর্ষিকও বটে। ইরান যুদ্ধ আসলে কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। মৃত্যুর গুজব মিথ্যা প্রমাণ করতে নেতানিয়াহু প্রকাম্যে বেরিয়ে এসে বৈঠক করেছেন সেনা কর্মকর্তাদের সাথে। বৈঠকে তিনি বলেছেন, সৈন্যদের মনোবল বাড়াতে আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে হবে। অর্থাৎ আরো অর্থ, আরো মৃত্যু ও ধ্বংস। ধ্বংসের এই অভিযাত্রায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নয়, অন্যভাবে যুক্ত হয়ে গেছে ইরানও। এদের ভ্রষ্ট ভাবনায় সভ্যতা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। পৃথিবীতে বাড়বে দুঃখ ও যন্ত্রণার মাত্রা। মহান স্রষ্টাতো পৃথিবীকে মানববন্ধন করে সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের মতো ক্ষুদ্র প্রভুরা পৃথিবীর সাথে বান্ধবের মতো আচরণ করেনি। এদের আচরণে পৃথিবীর জলবায়ু, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের সমাজ রাষ্ট্র, জীবন ও সংসার। এমন বাতাবরণে মাননবজীবন অর্থহীন হয়ে উঠছে। মানবকণ্ঠে এখন প্রয়োজন নতুন উচ্চারণশাসকরা কেন প্রভুব হবে? শাসকরা আগে মানুষ হোক এবং মহান প্রভুর বিধান মেনে সাম্য ও ন্যায়ের আলোকে দেশ এবং পৃথিবীকে গড়ে তোলার চেষ্টা করুক।