দেশ আবারও এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার মৌলিক রূপরেখা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক অনাস্থা, নির্বাচনকেন্দ্রিক বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক সংকট দেশের ওপর ছায়া ফেলেছিল, সেখান থেকে উত্তরণের প্রত্যাশাই এখন জনমনে প্রবল। বাস্তবতা হলো, অতীতের বেশ কয়েকটি নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়েছিল, বিরোধী কণ্ঠ দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। এ অভিজ্ঞতা শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছিল। ফলে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এ প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে যে প্রস্তুতি ও বক্তব্য সামনে আসছে, তা একটি ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, ভোটারদের জন্য সহায়ক অ্যাপ, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল সরঞ্জামের ব্যবহার এবং দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্রের নজরদারিÑএসব উদ্যোগ দেখায় যে রাষ্ট্র এবার প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিতে চায়। ভোট যেন কেবল বাক্সে পড়ে না থাকে, বরং তার প্রতিটি ধাপ নজরদারির আওতায় থাকেÑএই দর্শনই এখানে প্রতিফলিত হচ্ছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রবাসী নাগরিকদের অন্তর্ভুক্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবাসীদের ভূমিকা নতুন নয়। বিভিন্ন আন্দোলন, প্রতিবাদ ও জনমত গঠনে তারা বরাবরই সক্রিয় ছিলেন। তবে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ এবার যে মাত্রায় সংগঠিত হচ্ছে, তা এক নতুন দিগন্তের সূচনা। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের পরিসর ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আগমনও এ নির্বাচনের গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নয়; বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নতুন করে আগ্রহ ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, পর্যবেক্ষক আসা নিজেই সাফল্য নয়Ñসাফল্য নির্ভর করে তাদের সামনে কী ধরনের বাস্তব চিত্র উপস্থাপিত হয় তার ওপর।

গণভোটের প্রশ্নটি এ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও গভীর তাৎপর্য দিয়েছে। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’Ñযে রায়ই আসুক, সেটি যেন হয় নাগরিকদের স্বাধীন ও ভয়মুক্ত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। গণভোটের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারিত হলে, সেখানে অপশাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ, ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড। একই সঙ্গে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির যে আশার কথা বলা হচ্ছে, সেটিও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই হবে না। বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবে যে রাষ্ট্র পরিচালনা স্বচ্ছ, নীতিনির্ধারণ পূর্বানুমেয় এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ স্থিতিশীল। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী নিঃসন্দেহে একটি শক্তি; কিন্তু সে শক্তি তখনই সম্পদে রূপ নেবে, যখন রাষ্ট্র তাদের জন্য নিরাপদ ও ন্যায্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারবে।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো দায়িত্বশীলতা ও সংযম। রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা ক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে সহিংসতা ও উত্তেজনার পথে না নিয়ে গিয়ে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায়িত্ব বর্তায় নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার। আর নাগরিক সমাজের ভূমিকা হবে সচেতন নজরদারি ও ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করা।

আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট যদি সত্যিই সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়, তবে তা শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সফলতা হবে না; বরং দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশ যে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের পথে ফিরতে পারেÑতারই একটি দৃঢ় প্রমাণ হয়ে থাকবে। এ সুযোগ যেন কোনোভাবেই হাতছাড়া না হয়Ñএটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড়ো বিবেচ্য বিষয়।