রাষ্ট্রক্ষমতা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়, আইনের শাসন অপমানিত হয়, আর জনগণের আস্থা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সরকারি প্লট বরাদ্দ নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা এবং ভাতিজি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে আদালতের রায় সে সত্যটিকেই আবারও নির্মমভাবে স্মরণ করিয়ে দিল। ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের রায়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থাকা একজন ব্যক্তির পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ঘোষিত হওয়া-এ শুধু একটি মামলার বিচার নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার কতটা গভীরে শেকড় গেড়েছিল তার প্রতীকী উদাহরণ। একই মামলায় শেখ রেহানার সাত বছরের এবং টিউলিপ সিদ্দিকের দু’বছরের কারাদণ্ডও স্পষ্ট করে যে দুর্নীতি পরিবারতন্ত্রের ছায়ায় কীভাবে জালের মতো বিস্তৃত হয়েছিল।

দুদকের তদন্ত, চার্জশিট গ্রহণ, ৩২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি-সমগ্র বিচার প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল নয়, বরং দীর্ঘদিন উপেক্ষিত সত্যের প্রকাশ। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ, প্রকল্পের বরাদ্দে অনিয়ম এবং ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর মতো অপরাধ যখন শাসকগোষ্ঠীর উচ্চ পর্যায়ে সংঘটিত হয়, তখন পুরো রাষ্ট্রই এর পরিণতি ভোগ করে। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প মধ্যবিত্তের স্বপ্ন–স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং সুবিবেচনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-একজন প্রধানমন্ত্রী কেন একটি সরকারি প্লট পাওয়ার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন? কেন রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিরা মনে করেন যে দেশের সম্পদ তাঁদের পারিবারিক অধিকারের মতো? পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য একটি ন্যায়সংগত ও পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বপ্ন। সেখানে যদি ক্ষমতাসীনদের প্রভাবশালী বৃত্ত নিজেদের জন্য সুবিধা আদায় করে নেয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এ রায় শুধু তিনজনের জন্য শাস্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। দুর্নীতি যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন সেটি একদিনে নির্মূল করা যায় না। বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেও সেই প্রভাবের শিকড় সমাজ, প্রশাসন, রাজনীতি এবং অর্থনীতির নানা স্তরে ছড়িয়ে থাকে। তাই প্রয়োজন আরও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত প্রক্রিয়া, এবং প্রতিটি সরকারি বরাদ্দে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় হতে হবে, যাতে যেকোনো ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার দ্রুত জনগণের নজরে আসে।

দেখা যাচ্ছে, এ মামলায় আদালত নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করেছে। কিন্তু এটি যেন বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা না হয়। এই রায় রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে থাকা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক শক্ত প্রতীক হয়ে উঠতে পারেÑযদি তা ধারাবাহিকভাবে সব দুর্নীতিবাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। দেশের জনগণ বহুদিন ধরেই এমন সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করেছে, যেখানে ক্ষমতাধররা অবশেষে আইনের চোখে সমানভাবে বিচারিত হন।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাষ্ট্র যেন এ রায়কে দুর্নীতি বিরোধী সার্বিক সংস্কারের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও স্বাধীনতা দিতে হবে, প্রশাসনে দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করতে হবে, এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চায় ফিরে যেতে হবে। এ পরিবর্তনগুলো না হলে এমন রায় ভবিষ্যতে কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্লট দুর্নীতির এ রায় আমাদের লজ্জিত করে, একই সঙ্গে সতর্কও করে। লজ্জা এ কারণে যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এমন অপব্যবহার ঘটেছে; সতর্কতা এ কারণে যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই থেমে গেলে এমন অপকর্ম আবারও মাথা তুলবে। তাই এখন সময় দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার, এবং জনগণের আস্থাকে পুনরুদ্ধার করার। রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের সম্পদ নয়-এ রায় সেই সত্যটিই পুনর্ব্যক্ত করেছে। এখন দায়িত্ব আমাদের সবার-এ সত্যকে ধরে রাখা এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে একটি ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র রেখে যাওয়া।

এ রায় দেশবাসীর জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। লজ্জাজনক এ বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, দুর্নীতি যখন শীর্ষে বাসা বাঁধে, তখন সেটিকে ছেঁটে ফেলতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও নিরপেক্ষ, সাহসী এবং শক্তিশালী হতে হয়। আজ যারা বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন, তারা দেশের ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্য হলেও আইন তাদের ছাড় দেয়নিÑএটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, আইনের শাসনের বিজয়। রাষ্ট্রকে স্বচ্ছতার পথে ফিরিয়ে আনা আজ সময়ের দাবি এবং এ রায় সে পথচলার নতুন সূচনা হতে পারেÑযদি আমরা তা থেকে শিক্ষা নিতে প্রস্তুত থাকি।