পবিত্র ঈদুল ফিতর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসব ঘিরে মানুষের আনন্দ, আবেগ, পারিবারিক মিলনমেলা এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক বিশেষ আবহ তৈরি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদযাত্রা ও সার্বিক পরিস্থিতি সে আনন্দকে পূর্ণতা দিতে পারেনি। বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ভয়াবহ সড়ক ও রেল দুর্ঘটনা এবং সহিংসতার ঘটনা মানুষের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে দেশ পরিচালনার পর এবার আবার নতুন একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ঈদের ছুটিতে তা পূরণ হয়নি। বিশেষ করে ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের দুর্ভোগ কমানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।

ঈদ এলেই রাজধানী ও বড় শহরগুলো থেকে গ্রামে ফেরার জন্য লাখো মানুষের ঢল নামে। এটি আমাদের দেশের একটি স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা। কিন্তু এই স্বাভাবিক প্রবাহকে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করার জন্য যে পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, তার ঘাটতি বরাবরের মতো এবারও প্রকটভাবে সামনে এসেছে। সড়ক, রেল ও নৌপথÑতিন ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বিশৃঙ্খলা, টিকিট সংকট, দীর্ঘ যানজট এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ। পরিবহন খাতে একটি অসাধু চক্র প্রতিবছরই এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে, যা একদিকে অনৈতিক, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সড়ক ও রেল দুর্ঘটনার ক্রমবর্ধমান হার। কুমিল্লায় সংঘটিত সাম্প্রতিক ট্রেন-বাস সংঘর্ষের মতো ঘটনা গোটা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। এমন দুর্ঘটনা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং জবাবদিহিতার অভাবের ফল। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, অদক্ষ চালক, দুর্বল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, অপর্যাপ্ত সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তাহীনতাÑএসব সমস্যার কথা নতুন নয়, কিন্তু সমাধান আজও অধরাই রয়ে গেছে।

ঈদযাত্রার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও সমানভাবে উদ্বেগজনক। বিভিন্নস্থানে হামলা, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিতই দেয় না, বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটকেও সামনে আনে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু তা যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তবে তা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ঈদের মতো পবিত্র ও সংবেদনশীল সময়ে এ ধরনের ঘটনা জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক।

এমন পরিস্থিতির পেছনে যে বড় কারণটি বারবার সামনে আসে, তা হলো কার্যকর জবাবদিহিতার অভাব। দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, প্রতিবেদন তৈরি হয়, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়। অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে পার পেয়ে যায়, ফলে একই ধরনের অনিয়ম ও অবহেলা বারবার ঘটতে থাকে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং ধারাবাহিকতা না থাকলে কোনো ব্যবস্থাই টেকসই হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলোÑএ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, পরিবহন খাতে একটি সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কঠোর করা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রেলক্রসিংগুলোতে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিট কালোবাজারি এবং যাত্রী হয়রানি বন্ধে কঠোর নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের কাছে জনগণের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ঈদের মতো বড় একটি জাতীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের দুর্ভোগ কমানো কোনো অতিরিক্ত দায়িত্ব নয়; এটি সরকারের মৌলিক দায়িত্বেরই অংশ। অতএব, এখন সময় এসেছে সমস্যা চিহ্নিত করে দায়সারা প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার। অন্যথায় প্রতিবছরই ঈদের আনন্দের সঙ্গে মানুষের ভোগান্তির এই বেদনাদায়ক চিত্র বারবার ফিরে আসবেÑযা কোনোভাবেই একটি উন্নয়নশীল ও সম্ভাবনাময় দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না।