বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২০২৬) জন্য দ্বিতীয় মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। চারিত্রিক বিবেচনায় ঘোষিত মুদ্রানীতিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে প্রায় ৪ বছর ধরে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। দেশের উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের দাবি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট ১০ শতাংশে অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড.আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশে নেমে এলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট কমানো হবে। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন যে, আগামী জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশে নেমে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের এ প্রত্যাশা পূরণ হবার ন্যূনতম সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তাই নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট কমার কোন সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। অর্থনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা দেখা দিলে অন্যান্য ব্যবস্থার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে বাজারে মুদ্রার যোগান হ্রাস করার চেষ্টা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিডিউল ব্যাংকগুলোকে স্বল্প মেয়াদি ঋণদান অথবা ধার দেবার ক্ষেত্রে যে সুদ হার আরোপ করে তাকে পলিসি রেট বলা হয়। পলিসি রেট বাড়ানো হলে সিডিউল ব্যাংকগুলোকে আগের তুলনায় বেশি সুদ হারে ঋণ নিতে হয়। সিডিউল ব্যাংকগুলো সে ঋণকৃত অর্থ উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ঋণ গ্রহীতাদের নিকট বিনিয়োগের সময় আগের তুলনায় বেশি সুদ হার চার্জ করে। এতে ঋণের চাহিদা কমে যায় বাজারে অর্থের যোগান হ্রাস পায়। ফলে মূল্যস্ফীতি কমে আসে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হবার পর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) পলিসি রেট একাধিকবার বৃদ্ধি করে। সে সময় বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যন্ত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট একাধিকবার বৃদ্ধি করলেও ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার (গ্রাহকদের ঋণদানের সময় ব্যাংক যে সুদ চার্জ করে) ৯ শতাংশ ফিক্সড করে রাখে। ব্যাংকগুলো এ সময় ঋণ সংকোচন নীতি গ্রহণ করলেও সরকারি মদদপুষ্ট এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। এমনকি বিদেশে পাচার করে। ফলে মূল্যস্ফীতি না কমে বরং আরো বৃদ্ধি পায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিগত ১৮ মাসে নানাভাবে চেষ্টা করেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ হার ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন হার ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। যদি যথাসময়ে পলিসি রিট বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজার ভিত্তিক করা হতো তাহলে নিশ্চিতভাবেই মূল্যস্ফীতির উপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তো। প্রতিবেশি দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফলতা প্রদর্শন করেছে। এক সময় শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭৫ শতাংশ। এখন তা ২দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতির হার শুন্য দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ভারতের মূল্যস্ফীতির হার বর্তমানে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। নেপাল এবং পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির হার যথাক্রমে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত। দীর্ঘ মেয়াদে পলিসি রেট বৃদ্ধি করে রাখা হলে তা অভ্যন্তরীণভাবে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সে প্রবণতাই প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিটি সেক্টরে উৎপাদন কমে গেছে। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা রোধ করা যাবে না। বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাপনা মোটেও স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত নয়। বাজার ব্যবস্থার সংস্কার করা না হলে শুধু পলিসি রেট বাড়ানোর মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের বাস্তবমুখী চিন্তা করতে হবে।