ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এখন দোর গোড়ায়। প্রচার প্রচারণা চলমান। এ পরিস্থিতি সামনে রেখে পুলিশ, মাঠপ্রশাসন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একাংশের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মর্মে পত্রিকান্তরে খবর প্রকাশিত হয়েছে। যা খুবই উদ্বেগের। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, পদোন্নতি, প্রভাবশালী পদায়ন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান নিশ্চিত করতে এক শ্রেণীর কর্মকর্তা একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের আস্থাভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন- এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সূত্রে। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ সরাসরি দলীয় সভা-সমাবেশে উপস্থিত হচ্ছেন, আবার কেউ অফিসার্স ক্লাবের পাশাপাশি দলীয় কার্যালয়েও নিয়মিত যাতায়াত করছেন। সেখানে বসেই মনোনীত প্রার্থীদের জেতাতে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করা, পছন্দের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মীদের হয়রানির মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন তারা। ফলে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ বেরিয়ে আসছে যে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ জড়িয়ে পড়ছে প্রশাসনের একাংশ। যারা নিরপেক্ষ থাকতে চান, তাদের বিরুদ্ধে হয়রানি, বদলি কিংবা শাস্তিমূলক পদক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে।

এতে বলা হয়, গত ২০ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হঠাৎ করে আটজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করে। প্রজ্ঞাপন জারির পরদিনই অবমুক্তির অংশ বাতিল করা হয়, আর তার পরদিন পুরো বদলি আদেশই প্রত্যাহার করা হয়। নির্বাচনের মাত্র ২২ দিন আগে এমন নাটকীয় সিদ্ধান্ত প্রশাসনে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। জনপ্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের একাধিক সূত্র জানায়, একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের তদবিরেই এই বদলির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করায় দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের সরানোর চেষ্টা করেন। এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন ও জনপ্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে ভূমিকা রাখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসে থাকা অনেক কর্মকর্তা অতীতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের একাধিক শীর্ষ পদে এমন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় মাঠপ্রশাসনে নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ আরো জোরালো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পদায়নে সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা বিভাগে পদায়ন পাওয়া ২৯ জনের মধ্যে ১৫ জনই আগে থেকেই ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। লোভনীয় উপজেলাগুলোতে পছন্দের কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে, অন্যদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘পদায়ন যেন যোগ্যতার নয়, আনুগত্যের ভিত্তিতে হচ্ছে।’ অফিসার্স ক্লাবে বসে প্রভাবশালী কর্মকর্তারা মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের ফোন করে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের ‘সহযোগিতা’ করতে বলছেন- এমন অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউএনও বলেন, ‘সিনিয়ররা জিজ্ঞেস করছেন, অমুক প্রার্থীর জন্য কী করা যায়। পরে মূল্যায়ন করা হবে- এমন ইঙ্গিতও দেন।’ পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে। ‘পক্ষপাতদুষ্ট পুলিশ দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় বলে বলছের বিশ্লেষকেরা। বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকেও প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ করতে শোনা গেছে।

আমরা মনে করি গুরুতর অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। তা না হলে পুরো কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনার সাথে তা হবে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক, বিপ্লবের মূল চেতনা তা নয়। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এভাবে হতে পারে না। আমরা অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী সবার কাছে আহ্বান রাখতে চাই নির্বাচনী মাঠে কিছু উত্তাপ থাকলেও তা যেন লেভেল প্লেইং ফিল্ড থাকে, সব দল অবাধে প্রচার চালাতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা খুবই জরুরী। প্রশাসনের কোন দলের দিকে হেলে পড়া মোটেই কাম্য হতে পারে না। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তব প্রয়োগেও নিশ্চিত করতে হবে- এটাই এখন সময়ের দাবি।