সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণ রাষ্ট্রীয় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়। এ ক্ষেত্রে সামান্য অসামঞ্জস্য বা বাস্তবতা-বিবর্জিত সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে লাখো তরুণের জীবন পরিকল্পনা, কর্মজীবনের সম্ভাবনা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর। সর্বশেষ জারি করা ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এ বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

গত বছরের ১৮ নভেম্বর সরকার সব স্তরের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। উদ্দেশ্য ছিল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একক মানদ- তৈরি করা এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন বৈষম্য দূর করা। কিন্তু বাস্তবে এ সিদ্ধান্ত এক ধরনের ‘এক নিয়ম সবার জন্য’ দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেয়, যা বাংলাদেশের বৈচিত্র‍্যময় প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কারণ বহু সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগবিধি ও প্রবিধিমালায় বিভিন্ন পদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ৩৫, ৪০ এমনকি ৪৫ বছর পর্যন্ত বয়সসীমা নির্ধারিত ছিল।

বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পদগুলোতে অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা অপরিহার্য। ‘সরকারি অফিসের কম্পিউটার পারসোনেল নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৯’-এর আওতায় পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক, উপ-পরিচালক বা সিস্টেম ম্যানেজারের মতো পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৪৫ বছর পর্যন্ত বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখেই। কিন্তু ৩২ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা কার্যকর হওয়ার ফলে এসব বিধিমালা কার্যত নিস্ক্রীয় হয়ে পড়ে এবং যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রার্থীরা এক রাতের মধ্যে অযোগ্য হয়ে যান।

এর প্রভাব শুধু কারিগরি খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, চিকিৎসক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিদ্যমান বিশেষ বয়সসুবিধাও বাতিল হয়ে যায়। সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ সুবিধাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বহাল ছিল। হঠাৎ করে এসব সুবিধা বাতিল হওয়ায় ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ে। এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থা, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এবং চাকরিপ্রার্থীদের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আপত্তি ও প্রস্তাব জমা পড়ে। এর ফলশ্রুতিতেই সরকার সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করে ধারা ৩(ক) সংযোজন করেছে। নতুন ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগবিধিমালায় সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩২ বছরের বেশি বয়সসীমা নির্ধারিত রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে সে বয়সসীমাই বহাল থাকবে। এতে করে পূর্বের প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই দূর হলো এবং বাস্তবতার সঙ্গে আইনি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় ঘটল।

তবে এ সংশোধনকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এখনো প্রশ্ন থেকে যায়Ñকোন কোন পদ ও কোন কোন ক্ষেত্রে ৩২ বছরের সীমা কার্যকর হবে এবং কোথায় ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত নীতিমালা নেই। অধ্যাদেশের ভাষা সাধারণ চাকরিপ্রার্থী ও অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগকারী সংস্থার জন্যও ব্যাখ্যাগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে আবারও বিভ্রান্তি, মামলা-মোকদ্দমা বা প্রশাসনিক অচলাবস্থার আশঙ্কা থেকে যায়। রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। সরকারি চাকরি শুধু তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরির বিষয় নয়; একই সঙ্গে দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদকে কাজে লাগানোর বিষয়ও বটে। বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিনির্ভর পদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিল রাখা রাষ্ট্রীয় দক্ষতা বাড়ানোরই একটি উপায়।

সংশোধিত অধ্যাদেশ সরকারের আত্মসমালোচনার সক্ষমতা ও বাস্তবতা অনুধাবনের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও খাতভিত্তিক বয়সনীতি-যেখানে সব পদের জন্য একক সংখ্যা নয়, বরং কাজের প্রকৃতি, দায়িত্ব ও দক্ষতার প্রয়োজন অনুযায়ী বয়সসীমা নির্ধারিত হবে। অন্যথায়, নীতির ঘনঘন পরিবর্তন তরুণদের আস্থাহীনতা বাড়াবে এবং প্রশাসনিক কাঠামোকেও দুর্বল করবে। সরকারি চাকরির বয়সসীমা নিয়ে এ সংশোধন একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলেও, এটিকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে স্বচ্ছ নির্দেশনা, অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ এবং বাস্তবভিত্তিক সংস্কার অপরিহার্য। রাষ্ট্রের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা তখনই শক্তিশালী হবে, যখন নীতি হবে বাস্তবসম্মত, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক।