জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গতকাল শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। বিগত তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের আরাধ্য ছিল ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়া আর সে সাথে গণতন্ত্রকে অর্থবহরূপে চালু করা। স্বৈরাচারী ব্যবস্থা যাতে ফিরে আসতে না পারে সে লক্ষ্যে রাষ্ট্র সংস্কার এবং ছাত্র-জনতাকে হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন করাও ছিল মানুষের প্রধান দাবি। জুলাই সনদের মধ্য দিয়ে সে সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের এখন সময়। অন্যদিকে গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারও চলমান।

গণভোটে পাস হওয়া জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এখন জরুরী বিষয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে অঙ্গীকার করেছে এবং যার আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি হয়েছে জাতি এখন সংসদের অধিবেশনে তার প্রকাশ দেখতে চায়। সংসদের প্রথম অধিবেশন সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে চলে এবং এতে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এ সময়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদ তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে এ আশা সবার।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় নতুন নির্বাচিত সংসদকে প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কার্যকর থাকার কথা রয়েছে। গণভোট আয়োজন সংক্রান্ত আদেশে এমন নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে। গঠিত হবে সংসদের একটি উচ্চ কক্ষ। সে অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই দিনে দু’টি শপথ নেয়ার কথা ছিল- একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি জোটের সংসদ সদস্যরা এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা দু’টি শপথই গ্রহণ করেছেন। ফলে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগেই সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো সঙ্কটের কথা অস্বীকার করা হয়েছে। সরকারী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি তারা শতভাগ অঙ্গীকারাবদ্ধ। এটা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। তারা এতে স্বাক্ষর করেছে।

আমরা মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে যে ফলাফল অর্জিত হয়েছে কিছু কিছু অনিয়মের অভিযোগসহ বিরোধী দলসমূহ ফল মেনে নিয়ে অত্যন্ত উদারতার পরিচয় দিয়েছে। সকল দল সংসদের অধিবেশনে যোগদানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এটা বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি বড় অর্জন। সরকারী দল ও বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে নির্বাচনের পরে যে সৌহার্দ্য দেখা গিয়েছে তা খুবই প্রশংসনীয়।

আমরা মনে করি এ ধারা সংসদ অধিবেশনেও অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। সংসদ অধিবেশনকে কার্যকর করায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে সরকারী দলের। ক্ষমতাসীন বিএনপি সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে বলে আমরা আশাবাদী হতে চাই। যে কোন দেশের জাতীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট সরকারী ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি ব্যবস্থার নাম। কোন একটি অংশের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে তা কার্যকর হতে পারে না, অতীতে আমরা দেখেছি। সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একটি অধিক কার্যকরী সংসদে রূপ নেবে সেটাই সকলের আশা। আমরা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে প্রাণবন্ত ও দেশের জন্য উপকারী ও একই সঙ্গে কার্যকরী একটি জাতীয় সংসদ দেখার অপেক্ষায়। আমরা এই অধিবেশনের সফলতা কামনা করি।