সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় সরকার বিভিন্ন খাতে যে ভাতা প্রদান করেন তার হার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব খাতে ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মূলত, ৬ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ভাতা বাড়ানো হবে। কোন্ খাতে কী পরিমাণ ভাতা বাড়নো যেতে পারে তা নির্ধারণের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিদ্যমান ভাতার হার বাড়ানো হবে। বর্তমানে বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্ত নারীর এবং বয়স্ক ভাতার মাসিক হার হচ্ছে ৬শ’৫০টাকা। প্রতিবন্ধীদের মাসিক ভাতা ৯শ’ টাকা। মা ও শিশু সহায়তা খাতে মাসিক ভাতা ৮শ’৫০ টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২০২৬) সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পেনশন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পেনশন ব্যতীত সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। এটা মোট জিডিপির ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)র মান অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এডিবি সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দের যে মান নির্ধারণ করেছে তার চেয়ে বাংলাদেশের ব্যয় বরাদ্দের পরিমাণ অনেক কম।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ বছর থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় দারিদ্র্য বিমোচন তথা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন অত্যন্ত অপরিহার্য একটি দাবিতে পরিণত হয়েছে। গত প্রায় ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার আনুপাতিকভাবে বাড়ছে না। ফলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষগুলো খুবই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। করোনাকালে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গিয়েছিল। তাদের অধিকাংশই আর দারিদ্র্য সীমার উপরে উঠে আসতে পারেনি। করোনাকালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২২ শতাংশের মতো। বর্তমানে তা ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অবস্থা এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে দেশের সামাজিক অবস্থায় বিপর্যয় ঘটতে পারে। সে বিবেচনায় সামাজিক সুরক্ষা খাতের বিদ্যমান ভাতার হার বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত যৌক্তিক। বিগত সরকার আমলে সামাজিক সুরক্ষা খাতকে দলীয়ভাবে বিবেচনা করা হতো। যারা সরকার সমর্থক তাদের বেছে বেছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। সামাজিক সুরক্ষা খাতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে মারাত্মক দুর্নীতি সংঘটিত হতো। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যেতো যারা প্রকৃত পক্ষেই বিত্তহীন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ হারা তাদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক বিত্তবানদের সামাজিক সুরক্ষা কার্ড দেয়া হতো। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে গিয়ে অনেকেই নানাভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিবিধিরা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য উৎকোচ গ্রহণ করতেন। ফলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে যে ব্যয়বরাদ্দ দেয়া হতো তা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো না। আগামীতে সামাজিক সুরক্ষা খাতের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যারা সামাজিক সুরক্ষা খাতে অন্তর্ভুক্ত হবেন তাদের মধ্যে যারা শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান তাদের শুধু শুধু ভাতা না দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
‘কাজেই বিনিময়ে খাদ্য’ এ ধরনের কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাহলে তারা উৎপাদন কার্যক্রমে অবদান রাখতে পারবে এবং আর্থিকভাবে কিছুটা হলেও উপকৃত হতে পারবেন। একান্ত বাধ্য না হলে কাউকে বসিয়ে বসিয়ে অর্থ দেয়া কোনভাবেই সঙ্গত হবে না। সামাজিক নিরাপত্তায় ভাতা বৃত্তি ইতিবাচক। তবে সবার আগে যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তাহলো, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির নামে কেউ যাতে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট করতে না পারে।