॥ রফিকুল আমীন খান ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের দুই সহ¯্রাধিক শহিদ ও হাজারো আহত ছাত্র-জনতার রক্ত¯œাত এই নতুন বাংলাদেশে মানুষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করার স্বপ্ন দেখছেন। এরই মধ্যে সারাদেশে বিপুুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য শুরু হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা। দলীয় শোডাউন, ব্যানার, ফেস্টুনে এলাকাজুড়ে নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক প্রজন্মের একটি দীর্ঘ হতাশা এবং পঁচিশ বছরের না বলা ইতিহাস। মানুষ শেষবার প্রকৃত অর্থে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল ২০০১ সালে। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৫ বছর। ২০০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেন সমর্থিত সরকারের পাতানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা। মূলত এখান থেকেই ফ্যাসিবাদের গোড়াপত্তন। পরে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ এর বিনাভোট ও দিনের ভোট রাতে সম্পন্নের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ফ্যাসিবাদ। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে জুলাই বিপ্লব অনিবার্য হয়ে পড়েছিল; ছাত্র-জনতা জীবন দিয়ে যা সম্ভব করেছে।
ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া কেবল সরকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য একটি রাজনৈতিক দায় নয়; বরং পুরোনো ও ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে নতুন বাংলাদেশ গড়ার একটি নৈতিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত-এটাই দীর্ঘ দিন ভোটাধিকার বঞ্চিত মানুষের প্রত্যাশা। মানুষের চোখে-মুখে এরকম প্রত্যাশার ছাপই দেখা গেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নির্বাচন সামনে রেখে হাজারো মানুষ ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। অনেকে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে সভা-সমাবেশ ও নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।
আমার নির্বাচনী এলাকা বাউফল, পটুয়াখালী-২। দলীয় শোডাউন, ব্যানার, ফেস্টুনে এলাকাজুড়ে এরই মধ্যে নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে। এবারের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় বেশির ভাগ দলই জুলাই বিপ্লবের শহিদ ও আহতদের কম বেশি স্মরণ করছেন। জুলাই বিপ্লবে এ উপজেলার অন্তত সাতজন শহিদ হয়ছেন। আহত হয়েছেন বহু ছাত্র-জনতা। প্রার্থীদের মধ্যে জুলাই বিপ্লবের শহিদ ও আহতদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব রয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামির প্রার্থী ও সংগঠনের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি গত ২৯ ডিসেম্বর সাতজন শহিদ পরিবারের সদস্যদের নিয়েই নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্যে মনোনয়ন ফরম জমা দেন। এর আগে থেকেই শহিদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজ-খবর নেয়ার খবর উঠে আসে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায়। খবরে অনেক শহিদ পরিবারের ভরণ-পোষণও নেয়ার বিষয়ও উঠে আসে।
প্রশ্ন হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের বীরদের এই স্মরণ কি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সিমাবদ্ধ থাকবে, নাকি যে জন্য তাদের ত্যাগ স্বীকার সেই জনাকাক্সক্ষার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ন্যায়, ইনসাফ ভিত্তিক বৈষম্যহীন এবং দুর্নীতি, শোষণ, নিপিড়ন, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রতিদ্বন্দ্বিদের নির্বাচনীয় ভাবনায় সত্যিকার অর্থে গুরুত্ব পাবে? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আসন্ন নির্বাচনে বাউফলের সচেতন ও শিক্ষিত ছাত্রজনতা সারাদেশর মতো ভোটের মাঠে এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই এগোচ্ছেন।
এ প্রেক্ষাপটেই বাউফলের রাজনীতিতে সবচেয়ে উচ্চারিত নাম ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। ২০০২-০৩ সেশনে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় শিবির সভাপতি হওয়ার মধ্য তিনি রাজনীতির ময়দানে পরিচিতি পেতে শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০০৬-০৭ সেশনে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হন। তার রাজনীতি গড়ে উঠেছে দীর্ঘ ত্যাগ, নির্যাতন ও আপসহীন অবস্থানের ভেতর দিয়ে। বর্তমানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ ও মজলিসে শূরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ এর সেক্রেটারি। তার বাবা বাউফল কলেজের অধ্যাপক সিরাজ উদ্দীন খাঁন সাবেক শিক্ষক। তার স্ত্রী প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া ফারহানাও বাউফলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠে স্বামীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে। একই সঙ্গে তিনি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। ফলে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ শিক্ষাদিক্ষা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি সব মিলে হয়ে উঠেছেন বাউফলের গণমানুষের নেতা।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে একের পর এক মামলা। হামলা-মামলা, হুমকি ও সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার মুখেও তিনি পিছু হটেননি। সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের মতো তিনি সময়ের সঙ্গে অবস্থান বদলাননি। ফলে আজ তিনি কেবল একটি দলের প্রার্থী নন; তিনি হয়ে উঠেছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক। এ অবস্থায় বাউফলের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তা হলো ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের গ্রহণযোগ্যতা। বিরোধীদের অনেককেই আজ তার প্রশংসা করতে দেখা যাচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শহিদুল আলম তালুকদার। তিনি বিএনপির মনোনিত প্রার্থী এটাই তার বড় রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল দলীয় পরিচয় কি যথেষ্ট? বাউফলের শিক্ষিত ও তরুণ ভোটাররা বেশ ভালোভাবেই সবকিছু নিজেদের পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। ঢাকা থেকে গ্রামে গেলে এভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তাদের কথা থেকে প্রতিয়মান হয়, এবারের ভোটে মানুষ আর শুধু প্রতীক দেখে নয়; প্রার্থীর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞাতা, দেশপ্রেম, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় নির্যাতন, নিপিড়ন, গুম, খুনের বিরুদ্ধেও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় কে কতটুকু ভূমিকা রেখেছেন তা দেখে নিজেদের পছন্দ বাছাই করবেন।
অনেকের মনেই এ প্রশ্নও উঠছে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ছিল রাজনৈতিক মিত্র। তখন একসঙ্গে তারা ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করেছে। আজ সেই পুরোনো মিত্রকেই ‘যুদ্ধাপরাধী’, ‘স্বাধীনতাবিরোধী’, ‘গুপ্ত’, ‘মোনাফেক’ ইত্যাদি তকমা লাগানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিএনপির একটি অংশ। রাজনীতির এই নেতিবাচক চরিত্র মানুষ আরও দেখতে চায় না। জুলাই বিপ্লবের পর স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মদদে দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর একাধিক হামলা, হুমকিÑধমকি, দখলবাজি, চঁদাবাজি, নারি নির্যাতনসহ শক্তি প্রদর্শনের বিপরীতে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের পরিচ্ছন্ন ইমেজ ও শিক্ষাদিক্ষা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণে।
গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ হয়তো রাজনীতির ভাষা জানে না, কিন্তু তারা ন্যায়ের ভাষা বোঝে। তারা বোঝেন যে রাজনীতি ভয় দেখিয়ে ভোট আদায় করতে চায়, সে রাজনীতি আবারও ফ্যাসিবাদের জন্ম দেবে। বিশেষ করে শিক্ষিত ও সচেতন ভোটারদের আজ স্পষ্ট দাবি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভোটের মাঠে সমান সুযোগ। তারা নতুন বাংলাদেশ চায়।
বাউফল দক্ষিণাঞ্চলের নদী বেষ্টিত একটি উপজেলা হলেও এখানে শিক্ষিতের হার অনেক বেশি। এখানেই শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পৈত্রিক বাড়ি। এখানকার শিক্ষিত ও তরুণ সমাজ সব সময়ই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন। স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোররাও ফ্যাসিবাদ কাকে বলে ও এ চরিত্র সম্পর্কে সচেতন। নিয়মিত পত্রিকা পড়েন, সোশ্যাল মিডিয়ায়ও তাদের ভালোই বিচরণ। তারা দেখেছেন ফ্যাসিবাদী আমলে গুম হওয়া সন্তান, লাশ হয়ে ফেরা ভাই। দেখেছেন ফারাক্কা বাঁধে নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোর মৃত্যু। দেখেছে সীমান্তে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর নিথর দেহ। পিলখানায় ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যার পেছনে ছিল বিদেশী মদদ ও দেশীয় দোসরদের ভূমিকা। তারা ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ছত্রছায়ায় শাহবাগী নাস্তিক্যবাদী শক্তির উত্থান, ইসলাম বিদ্বেষ, কুরআন অবমাননা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অশালীন আক্রমণও তারা প্রত্যক্ষ করেছেন। এই সবকিছু মিলিয়েই মানুষ আজ এমন নেতৃত্ব খুঁজছে, যারা বিদেশি আধিপত্যের কাছে মাথা নত করবে না, যারা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন থাকবে। এসব বিবেচনায় ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ অন্যদের থেকে আলাদা।
পরোলোকগত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ড. শফিকুল ইসলামের ওপর আওয়ামী ফ্যাসিবাদি সরকারের অকথ্য নির্যাতনের কঠোর প্রতিবাদ করেছিলেন- যা এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাসছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ রকম আরও ইতিবাচক কর্মক- বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নির্মম-নির্যাতনের বিভিন্ন সময়ের চিত্র, সে সময় রাজপথে তার অবদান-এসব এলাকার চায়ের দোকানে মানুষের মুখে মুখে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বাউফলবাসী শহিদুল আলম তালুকদারকে নির্বাচিত করেছিলেন। ফ্যাসিবাদী শাসনের ১৬ বছরে তার কোন ভূমিকা কিংবা উল্লেখযোগ্য কোন কার্যক্রম বাউফলবাসীর স্মরণে নেই।
অন্যদিকে বিগত ২৫ বছরে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের উত্থানের গল্পটা শুধু বাউফলে নয় সারাদেশেই আলোচিত। তার জোরালো কণ্ঠস্বর, ক্ষুরধার যুক্তি, ইসলামিক জ্ঞান, অগাধ পা-িত্যের সাথে দশদলের পূর্ণসমর্থন তাকে ভোটের মাঠে প্রতিপক্ষের তুলনায় শক্ত অবস্থানে রেখেছে। সবমিলে এবারের নির্বাচন বাউফলের জন্য কেবল একজন এমপি নির্বাচনের প্রশ্ন নয়; এটি ২৫ বছরের জমে থাকা পাওয়া-না পাওয়ার রায়। আর সেই রায়ে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদই এগিয়ে।
লেখক : বাউফলের সন্তান ও সহকারী পরিচালক, জনসংযোগ বিভাগ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।