বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিআইআরসি) ২৩ নভেম্বর রাজধানীতে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে সংস্থাটির কর্মকর্তাগণ জানিয়েছে, সংস্থাটি সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সার উৎপাদনকারি কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চিয়তা দিয়ে গ্যাসের মূল্য ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগামী মাসের এক তারিখ থেকে গ্যাসের এ বর্ধিত মূল্য কার্যকর হবে। সংস্থাটি এটাও জানিয়েছে যে, সার কারখানায় সরবরাহকৃত গ্যাসের মূল্য বাড়লেও সারের মূল্য আগের মতোই স্থিতিশীল থাকবে। কারণ সরকার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)কে ভর্তুকি প্রদান করবে। ফলে কৃষক পর্যায়ে সারের মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকবে না। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের সরবরাহ না পাবার কারণে দেশের সার কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। অপর্যাপ্ত গ্যাসের কারণে সার উৎপাদনকারি কারখানাগুলো বেশির ভাগ সময়ই উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। যে কোন উৎপাদন কার্য সচল রাখতে জ্বালানি শক্তির ব্যবহারের কোন বিকল্প এখনো আবিস্কৃত হয়নি। সাধারণত চারটি সূত্র থেকে জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে জ্বালানি তেল, কয়লা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ। এর মধ্যে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল পাওয়া যায় না। কয়লা পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বিদ্যুৎ উৎপাদনও সার্বিক চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়।
বিদ্যুতের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম। ফলে বাংলাদেশকে উৎপাদন কার্য পরিচালনার জন্য মূলত গ্যাসের উপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ গ্যাস সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও অপরিকল্পিত এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে গ্যাসের সরবরাহ দ্রুত কমে আসছে। দ্রুত নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কার এবং উত্তোলন শুরু করা না গেলে বর্তমান মজুত গ্যাস দিয়ে আগামী ১২/১৩ বছরে চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে। তারপর বাংলাদেশ সম্পূর্ণরূপে গ্যাস শূন্য হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে সার কারখানায় সরবরাহকৃত প্রতি ঘনফুট গ্যাসের মূল্য নেয়া হচ্ছে ১৬ টাকা। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে তা ২৯ টাকা ২৫ পয়সায় উন্নীত করা হবে। এলএনজি আমদানি খাতে চলতি অর্থবছরে(২০২৫-২০২৬) মোট ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেবে সরকার। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা প্রদান করা হবে।
সার কারখানাগুলো বর্ধিত মূল্যে যে গ্যাস ক্রয় করবে তার বিপরীতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন সার কারখানাগুলোকে ভর্তুকি প্রদান করবে। দেশে বর্তমানে সারের বার্ষিক চাহিদা হচ্ছে ৩২ লাখ টন। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে দেশে সার উৎপাদিত হয়েছে ৭ লাখ ৪০ হাজার টন। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে সার উৎপাদিত হয় ৬লাখ ৬০ হাজার টন। আর ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সার উৎপাদিত হয় ১১ লাখ ১৫ হাজার টন। দেশের শীর্ষস্থানীয় তিনটি সার কারখানাকে প্রতি বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে ১৪০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেছে বছরে সার উৎপাদন ১৮ থেকে ১৯ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাস সঙ্কটের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকা ৫টি সার কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে যমুনা সার কারখানাটি মাত্র ১৪ দিন আংশিকভাবে উৎপাদন কার্য পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। বছরের অবশিষ্ট ৩৫১ দিনি এই কারখানা বন্ধ ছিল।
আশুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধ ছিল ২৫৯দিন। সার কারখানাগুলো যদি তাদের উৎপাদন সক্ষমতা পুরো মাত্রায় ব্যবহার করতে পারতো তাহলে সার সঙ্কট অনেকটাই কমে যেতো। সার কারখানাগুলোতে সরবরাহকৃত গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর বদলে মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হলে সেটাই বরং ভালো হতো। সরকার যে ভর্তুকি দিবে তা গ্যাস কোম্পানিগুলোকে দিলে তারা তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে সার কারখানায় গ্যাসের যোগান নিশ্চিত করতে পারতো। তবে যে ভাবেই ভর্তুকি প্রদান করা হোক না কেন সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষক যাতে সঠিক এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সার সরবরাহ পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। আর এর পেছনে রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম। জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড (এফএও) এর প্রতিবেদেন মোতাবেক, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৬ কোটি ৪৬ লাখ টন খাদ্য শস্য উপাদিত হয়। এর মধ্যে ধান ৫ কোটি ৮৬ লাখ টন, ভুট্টা ৪৭ লাখ টন এবং গম ১৩ লাখ টন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে কৃষি খাতে ভর্তুকি বন্ধ করার জন্য একাধিকবার চাপ দিয়েছে। কিন্তু সরকার সে চাপের নিকট নতি স্বীকার করেনি। কৃষি খাতে সাফল্যের অন্যতম কারণ হচ্ছে কৃষি ভর্তুকি। কাজেই আগামীতেও কৃষি ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে।